প্রাণঘাতী ক্যানসার চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক দুটি বড় আবিষ্কার এই মরণব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। এখন আর রোগীকে হাসপাতালে দীর্ঘ সময় কষ্ট পেতে হবে না। মাত্র কয়েক মিনিটের ইনজেকশন কিংবা ত্বকের নিচের প্রয়োগেই মিলছে চমৎকার ফলাফল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই যুগান্তকারী অগ্রগতির তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ডে হাজার হাজার ক্যানসার রোগীর জন্য অতি দ্রুত কাজ করে এমন একটি ইমিউনোথেরাপি ইনজেকশন চালু হচ্ছে। দেশটির সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) অত্যন্ত আধুনিক এই চিকিৎসা পদ্ধতি আনতে যাচ্ছে। এই নতুন ইনজেকশনের নাম ‘পেমব্রোলিজুম্যাব’। এতদিন পর্যন্ত এই জীবনরক্ষাকারী ক্যানসারের ওষুধটি স্যালাইনের মাধ্যমে রোগীর শিরায় পুশ করতে হতো। এই পুরো চিকিৎসায় একজন রোগীর প্রায় দুই ঘণ্টা বা তার বেশি সময় লেগে যেত। তবে নতুন প্রযুক্তির কল্যাণে এখন একই ওষুধ মাত্র দুই মিনিটেরও কম সময়ে শরীরে প্রবেশ করানো সম্ভব হবে।
চিকিৎসকদের মতে, পেমব্রোলিজুম্যাব মূলত শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর কাজ করে। মানবদেহে ‘পিডি-১’ নামের একটি প্রোটিন থাকে, যা ক্যানসার প্রতিরোধে এক ধরনের ‘ব্রেক’ হিসেবে কাজ করে। এই ওষুধটি সেই পিডি-১ প্রোটিনকে সফলভাবে বাধা দেয়। এর ফলে শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ক্যানসার কোষগুলোকে সহজে চিনে নিয়ে সেগুলোর ওপর আক্রমণ চালায়। এনএইচএসের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে দেশটিতে এই থেরাপি গ্রহণ করা প্রায় ১৪ হাজার রোগী রয়েছেন। নতুন এই ইনজেকশন চালু হলে এদের একটি বিশাল অংশ সরাসরি উপকৃত হবেন। শুধু তাই নয়, এর ফলে ক্যানসার চিকিৎসায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের বছরে প্রায় এক লাখ ঘণ্টারও বেশি সময় বেঁচে যাবে।
এর আগে গত বছরও যুক্তরাজ্যে ‘নিভোলুম্যাব’ নামের আরেকটি দ্রুতগতির ইমিউনোথেরাপি ইনজেকশন অনুমোদন পেয়েছিল। সেটি প্রয়োগ করতে সময় লাগে মাত্র তিন থেকে পাঁচ মিনিট। নতুন পেমব্রোলিজুম্যাব যুক্ত হওয়ার পর এনএইচএসে এখন প্রায় ৩০টি ভিন্ন ধরনের ক্যানসার নিরাময়ে দুটি দ্রুতগতির ইমিউনোথেরাপি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলো। এনএইচএসের জাতীয় ক্যানসার ক্লিনিক্যাল পরিচালক অধ্যাপক পিটার জনসন এ বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, এই ইমিউনোথেরাপির আধুনিক সংস্করণ হাজারো রোগীর জন্য জীবনরেখা হিসেবে কাজ করছে। এর ফলে রোগীদের আর দীর্ঘ সময় হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকতে হবে না। তারা খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনে ফিরে যেতে পারবেন।
অন্যদিকে, ক্যানসার চিকিৎসায় দ্বিতীয় আরেকটি বড় সুসংবাদ এসেছে একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল থেকে। বিশ্বের ১১টি দেশে যৌথভাবে পরিচালিত এই গবেষণায় ‘অ্যামিভান্টাম্যাব’ নামের একটি নতুন ইনজেকশনের অভাবনীয় কার্যকারিতা দেখা গেছে। বিখ্যাত ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জনসন অ্যান্ড জনসন এই ইনজেকশনটি তৈরি করেছে। মূলত যেসব রোগীর ক্যানসার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে (মেটাস্ট্যাসিস) কিংবা যাদের ওপর প্রচলিত অন্য কোনো চিকিৎসা আর কাজ করছিল না, তাদের ক্ষেত্রে এই ইনজেকশনটি প্রয়োগ করা হয়।
পরীক্ষামূলকভাবে মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগীর ওপর এই ট্রায়াল চালানো হয়েছিল। ফলাফলে দেখা যায়, ৪৩ জন রোগীর শরীরের টিউমার আগের চেয়ে অনেক ছোট হয়ে গেছে অথবা পুরোপুরি গায়েব হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১৫ জন রোগীর দেহ থেকে ক্যানসার টিউমার একেবারে নির্মূল হয়ে গেছে। শুধু মাথা বা ঘাড় নয়, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও এই ওষুধটি অত্যন্ত ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, অ্যামিভান্টাম্যাব সরাসরি শিরায় না দিয়ে রোগীর ত্বকের নিচে ইনজেকশন হিসেবে পুশ করা হয়। এটি মূলত মানবদেহে তিনমুখী অ্যাকশন বা উপায়ে কাজ করে। প্রথমত, এটি ‘ইজিএফআর’ (EGFR) নামের একটি বিশেষ প্রোটিনকে শরীরে ব্লক বা বাধা দেয়, যা ক্যানসার টিউমার দ্রুত বৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয়ত, এটি ‘এমইটি’ (MET) নামক একটি কোষীয় পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, যে পথটি ব্যবহার করে ক্যানসার কোষগুলো অন্যান্য চিকিৎসা ফাঁকি দিয়ে বেঁচে থাকে। তৃতীয়ত, এটি সরাসরি শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে ক্যানসার ধ্বংস করার জন্য দারুণভাবে উদ্দীপ্ত করে।
এই ইনজেকশনটি প্রতি তিন সপ্তাহে মাত্র একবার রোগীকে দিতে হয়। আশার কথা হলো, ট্রায়ালে অংশ নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত সামান্য এবং মৃদু বা মাঝারি মাত্রার। এই ট্রায়ালে অংশ নিয়েছিলেন ৬৫ বছর বয়সী জিহ্বার ক্যানসার আক্রান্ত রোগী কার্ল ওয়ালশ। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, তার ওপর প্রচলিত কেমোথেরাপি এবং আগের ইমিউনোথেরাপি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। তবে অ্যামিভান্টাম্যাব নেওয়ার পর তিনি জাদুর মতো উপকার পেয়েছেন। মাত্র দুটি সাইকেল বা ডোজ নেওয়ার পরই তার জিহ্বার তীব্র ব্যথা এবং ফোলা ভাব কমে গেছে। দীর্ঘদিন পর তিনি এখন স্বাভাবিক খাবার মুখে তুলতে পারছেন।
বর্তমানে এই ওষুধের কার্যকারিতা আরও বিস্তৃত পরিসরে যাচাই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০টি ভিন্ন ভিন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে অ্যামিভান্টাম্যাবের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ক্যানসার চিকিৎসায় এই জোড়া আবিষ্কারকে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ক্যানসারমুক্ত পৃথিবী গড়ার পথে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। আশা করা হচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে ক্যানসার আর কোনো মরণঘাতী আতঙ্ক থাকবে না, বরং সাধারণ ইনজেকশনের মাধ্যমেই মানুষ এই রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাবে।
