দেশের স্বাস্থ্য খাতে প্রতিবছর এই সময়ে একটি পরিচিত আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু। এডিস মশাবাহিত এই রোগটি এখন আর শুধু নির্দিষ্ট বর্ষা মৌসুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে সারা বছরই দেশের কোথাও না কোথাও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তবে বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে এসে সংক্রমণের তীব্রতা অনেক বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে কেবল আক্রান্তের সংখ্যাই বাড়েনি, বরং এই ভাইরাসের চরিত্র ও লক্ষণেও বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং এডিস মশার বংশবৃদ্ধির অনুকূল আবহাওয়া এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বর্তমানে ডেঙ্গু ভাইরাসের এই চারিত্রিক পরিবর্তনের কারণে সাধারণ মানুষের পক্ষে এর ভয়াবহতা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে নিজের ও পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সচেতনতা ও প্রতিরোধকৌশলে দ্রুত পরিবর্তন আনা জরুরি। চিকিৎসকেরা মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করে বলছেন, ডেঙ্গুর চিরাচরিত বা ক্ল্যাসিক্যাল রূপ এখন আর তেমন দেখা যাচ্ছে না। আগে ডেঙ্গু হলে রোগীর তীব্র জ্বর হতো। এর পাশাপাশি চোখে ব্যথা, পিঠ ও অস্থিসন্ধিতে প্রচণ্ড ব্যথা হতো। এই তীব্র ব্যথার কারণেই রোগটিকে একসময় ‘হাড়ভাঙা জ্বর’ বলা হতো। এছাড়া শরীরে লালচে র্যাশ বা দাগ ওঠার মতো স্পষ্ট কিছু লক্ষণ দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানের ডেঙ্গু অনেক বেশি ছদ্মবেশী রূপ ধারণ করেছে।
লক্ষণহীন বা মৃদু জ্বর
অনেক সময় আক্রান্ত রোগী বুঝতেই পারেন না যে তিনি ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সামান্য একটু জ্বর বা শরীরে ম্যাজম্যাজ ভাব অনুভব হতে পারে। কিন্তু এই মৃদু উপসর্গের দু-এক দিনের মধ্যেই হঠাৎ করে রোগীর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটছে।
জ্বর কমলেই আসল বিপদ
অতীতে সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল যে জ্বর কমে যাওয়া মানেই রোগী সুস্থতার দিকে যাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। জ্বর কমে যাওয়ার পর রোগীর শরীরে ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ বা সংকটময় সময় শুরু হয়। আর তখনই আসল জটিলতাগুলো দেখা দেয়। এই সময়ে রোগীর রক্তচাপ হঠাৎ কমে যায়। একই সঙ্গে রক্তে প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা দ্রুত ড্রপ করার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, জ্বর যেদিন থেকে কমা শুরু করে, সেদিন থেকে পরবর্তী তিন দিন পর্যন্ত সময়টা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এ সময় অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে। এই সংকটময় দিনগুলোয় নিয়মিত বিরতিতে প্লাটিলেট কাউন্ট পরীক্ষা করা জরুরি। এই অবস্থায় রোগীকে প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল খাবার খাওয়াতে হবে।
অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হওয়া
নতুন চরিত্রের ডেঙ্গুতে রোগীর গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে লিভার, কিডনি বা মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। এখন রোগীদের ক্ষেত্রে জ্বরের চেয়ে বমি, তীব্র পেটব্যথা, পাতলা পায়খানা কিংবা অতিরিক্ত ক্লান্তির মতো উপসর্গগুলো বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। বিশেষ করে রোগীর প্রচুর বমি হওয়া, পেটের ডানপাশের ওপরের দিকে তীব্র ব্যথা হওয়া এবং জন্ডিস দেখা দেওয়া মূলত লিভার আক্রান্ত হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ। এমন উপসর্গ দেখা দিলে কোনো দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ডাবল ইনফেকশন বা দ্বিতীয়বার সংক্রমণ
ডেঙ্গু ভাইরাসের মূলত চারটি ভিন্ন ভেরিয়েন্ট বা ধরন রয়েছে, যা ডেন–১, ২, ৩ এবং ৪ নামে পরিচিত। অতীতে কোনো একটি ভেরিয়েন্টে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তি যখন দ্বিতীয়বার অন্য কোনো নতুন ভেরিয়েন্টে আক্রান্ত হচ্ছেন, তখন ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এই ডাবল ইনফেকশনের কারণে রোগীরা ‘ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার’ বা ‘শক সিনড্রোমে’ চলে যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি রোগীর জন্য অত্যন্ত মারাত্মক ও জীবনঘাতী হতে পারে। ডেঙ্গুর এই রূপটিকেও চিকিৎসকেরা নতুন ও বিপজ্জনক চরিত্র হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
সারা দেশে এডিস মশার বিস্তার এবং ভাইরাসের এই নতুন আচরণ প্রতিরোধে এখন প্রথাগত চিকিৎসার বাইরে বাড়তি সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি ঘরের ভেতরে মশার কামড় থেকে বাঁচতে মশারি ও প্রতিরোধক সামগ্রী ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে সামান্য জ্বর বা শারীরিক অস্বস্তি হলেও অবহেলা না করে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো উচিত। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই পারে এই ছদ্মবেশী ডেঙ্গুর হাত থেকে মূল্যবান প্রাণ রক্ষা করতে।
