সন্তানের জন্ম প্রতিটি মায়ের জীবনে এক অনন্য ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে অস্ত্রোপচার বা সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই কৃত্রিম পদ্ধতির ভিড়ে অনেক প্রসূতি মা এখনও স্বাভাবিক প্রসব বা নরমাল ডেলিভারির প্রতি গভীর আগ্রহ দেখান। চিকিৎসকদের মতে, যোনিপথে স্বাভাবিক উপায়ে সন্তান প্রসবই মা ও শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে কার্যকরী এবং নিরাপদ মাধ্যম। তবে একটি সফল ও জটিলতাহীন স্বাভাবিক প্রসবের জন্য গর্ভকালীন সময় থেকেই সুনির্দিষ্ট কিছু মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
পদ্ধতি নির্ধারণের মূল ভিত্তি চিকিৎসকরা জানান, একজন গর্বতীবতী নারী কোন পদ্ধতিতে সন্তান জন্ম দেবেন তা অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে মায়ের বয়স, পূর্বের কোনো মেডিকেল রেকর্ড বা জটিলতা, অতীতে গর্ভপাত হয়েছে কি না, গর্ভের শিশু ও গর্ভফুলের সঠিক অবস্থান অন্যতম। প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করে গাইনি চিকিৎসকরাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। তবে এই সিদ্ধান্তের বাইরে মায়ের নিজস্ব ইচ্ছাশক্তিও বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম কাজল জানান, স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রসূতি মায়ের মানসিক দৃঢ়তা এবং ইতিবাচক মানসিকতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তব অভিজ্ঞতা: জান্নাতুল মাওয়ার লড়াই গাজীপুরের বাসিন্দা ও গৃহিণী জান্নাতুল মাওয়ার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ। ২০১৯ সালে তাঁর প্রথম সন্তান প্রসবের সময় ঢাকার মিরপুরের একটি ম্যাটারনিটি হাসপাতালের चिकित्सक আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্ট দেখে সন্তান প্রসবের প্রত্যাশিত তারিখের (১৪ জুন) অনেক আগেই সিজার করার পরামর্শ দেন। রেগুলার চেকআপের অংশ হিসেবে ৫ মে হাসপাতালে গেলে ডাক্তার বলেন মায়ের পেটে পানির পরিমাণ কমে গেছে। তাই ১৮ মে সিজারের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। পানি কম থাকার পরও ১৪ দিন পরে সিজারের ডেট দেওয়ায় পরিবারের মনে খটকা জাগে।
এরপর জান্নাতুল মাওয়া চাঁদপুরে তাঁর বাবার বাড়ির একটি সরকারি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে দ্বিতীয় মতামত নেন। সেখানকার চিকিৎসকরা আগের রিপোর্ট পরীক্ষা করে আশ্বস্ত করেন যে, পানির পরিমাণ সামান্য কম হলেও তা স্বাভাবিক প্রসবের জন্য পর্যাপ্ত। পরবর্তীতে ২৫ মে ভোরে প্রসব বেদনা উঠলে ১৯ দিন আগেই তিনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে প্রথম সন্তানের জন্ম দেন। এই ধারাবাহিকতায় তিনি তাঁর পরবর্তী দুই মেয়েকেও চিকিৎসকদের উৎসাহে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই জন্ম দিয়েছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি তাঁর তৃতীয় সন্তানও ডেটের তিন দিন পরে স্বাভাবিকভাবে ভূমিষ্ঠ হয়।
মানসিক দৃঢ়তা ও ভীতি দূরীকরণ স্বাভাবিক প্রসবের জন্য গর্বতীবতী মাকে প্রথমত মানসিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হতে হবে। অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম কাজল বলেন, স্বাভাবিক প্রসবের প্রক্রিয়াটি আসলে কী এবং এর ঝুঁকি নিতে মা প্রস্তুত কি না, তা আগে থেকেই ভাবা উচিত। একই সাথে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতির জন্য পরিবারকে তৈরি থাকতে হবে। প্রসবের সময় কোনো বড় জটিলতা দেখা দিলে যেন তাৎক্ষণিকভাবে সিজার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, সেই মানসিক প্রস্তুতিও রাখা প্রয়োজন। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের (এনএইচএস) নির্দেশনা অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় সব ধরনের নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে থাকতে হবে এবং মন শান্ত রাখতে হবে। চিকিৎসকরা এই সময়ে মানসিক প্রশান্তি পেতে পছন্দের গান শোনার পরামর্শ দেন। একটি ইতিবাচক ও আনন্দময় পরিবেশ স্বাভাবিক প্রসবকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ ও সুষম পুষ্টির গুরুত্ব গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরের ওজন অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। অতিরিক্ত ওজন কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম ওজন—উভয় পরিস্থিতিই গর্ভকালীন নানাবিধ জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, হবু মায়ের ওজন বেশি হলে তা সুনিয়ন্ত্রিত উপায়ে কমাতে হবে এবং কম থাকলে উচ্চতা ও বয়স অনুযায়ী বৃদ্ধি করতে হবে। অধ্যাপক কাজল জানান, গর্বতীবতী মায়ের ওজন যেন অতিরিক্ত বৃদ্ধি না পায়, সে জন্য পুষ্টিকর খাবারের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। প্রসূতি মায়ের দৈনিক খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে তাজা ফলমূল, সবুজ শাকসবজি, চর্বিহীন প্রোটিন, প্রয়োজনীয় শর্করা, ভিটামিন এবং আয়রনসমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক।
নিয়মিত হাঁটা ও বিশেষ শারীরিক व्यायाम স্বাভাবিক প্রসব সহজ করার জন্য নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। তিন সন্তানের সফল জননী জান্নাতুল মাওয়া জানান, চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি গর্ভাবস্থায় প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতেন এবং নিয়মিত হাঁটতেন। চিকিৎসকরা তাঁকে ১৫ মিনিট হাঁটার পর সামান্য জলপান করে বিশ্রাম নিয়ে পুনরায় ১৫ মিনিট হাঁটার পরামর্শ দিতেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, তলপেটের মাংসপেশি এবং হাড়ের জয়েন্টগুলোকে শিথিল করার জন্য কিছু বিশেষ ব্যায়াম রয়েছে। এর মধ্যে স্কোয়াটিং, কেজেল এক্সারসাইজ, হিপ ওপেনিং এবং পেরিনিয়াল ম্যাসাজ অন্যতম। একটি আড়াই থেকে তিন কেজি ওজনের শিশু প্রসবের জন্য পেলভিক মাসল বা তলপেটের পেশিগুলো প্রসারিত হওয়া প্রয়োজন, যা এই ব্যায়ামগুলোর মাধ্যমে সহজ হয়। এর মধ্যে পেরিনিয়াল ম্যাসাজ জরায়ুকে দ্রুত প্রসারিত করতে এবং প্রসবের চাপমুক্ত শ্রমের জন্য শরীরকে শিথিল রাখতে দারুণ সাহায্য করে।
পূর্বনির্ধারিত প্রসব পরিকল্পনা বা ডেলিভারি প্ল্যান যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের মতে, প্রসবকালীন শেষ মুহূর্তের অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা এড়াতে একটি সুনির্দিষ্ট প্রসব পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। প্রসববেদনা ওঠার লক্ষণগুলো পরিবারের অন্য সদস্যদের জানতে হবে। ব্যথা উঠলে কোন হাসপাতালে যাওয়া হবে, কোন চিকিৎসকের অধীনে ডেলিভারি হবে, জরুরি প্রয়োজনে রক্ত কে দেবে এবং প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান কীভাবে হবে—তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখতে হবে। যেহেতু স্বাভাবিক প্রসব হতে ১ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, তাই সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও নবজাতকের উন্নত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করে এমন নির্ভরযোগ্য হাসপাতাল নির্বাচন করা জরুরি। এ কারণেই গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকার প্রতি বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
উপসংহার পরিণতিতে বলা যায়, সিজারিয়ান অপারেশন কোনো সাধারণ বিকল্প নয়, এটি কেবলই একটি জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা। একটি সুস্থ ও সুন্দর আগামীর জন্য আমাদের মায়েদেরকে কৃত্রিমতার খোলস থেকে বের হয়ে প্রাকৃতিকভাবে সন্তান জন্মদানে উৎসাহিত করতে হবে। নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা, পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ, সঠিক প্রসব পরিকল্পনা এবং উপযুক্ত শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতিই পারে একজন মাকে নিরাপদ ও স্বাভাবিক মাতৃত্বের আনন্দ দিতে।
