আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে সুস্থ থাকা এবং শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য মানুষ কত কিছুই না করে। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ওজন কমানোর অত্যন্ত সহজ ও কার্যকর দুটি উপায় সামনে এসেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাতে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এবং সকালে দ্রুত নাশতা করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে।
স্পেনের বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথ (আইএসগ্লোবাল)-এর একদল গবেষক এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন। তারা ৪০ থেকে ৬৫ বছর বয়সী ৭ হাজার ৭৪ জন ব্যক্তির খাবার গ্রহণ এবং ওজনের তথ্য দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, যারা রাতে জলদি রাতের খাবার বা ডিনার সারেন এবং সকালে দ্রুত সকালের নাশতা বা ব্রেকফাস্ট করেন, তাদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) পাঁচ বছর পর তুলনামূলকভাবে কম ছিল। একই সাথে এই দুই খাবারের মাঝখানের সময়ে অন্য কোনো কিছু খাওয়া থেকে তারা বিরত ছিলেন।
যদিও স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন পরিমাপের ক্ষেত্রে বিএমআই-কে একমাত্র নিখুঁত মাধ্যম মনে করা হয় না এবং এটি নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে, তবুও এই গবেষণাটি স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। খাবার খাওয়ার নির্দিষ্ট সময় কীভাবে মানুষের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে চলমান গবেষণার পালে এটি নতুন হাওয়া দিয়েছে।
গবেষকদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি মানুষের শরীরের ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। মানুষের শরীরে একটি ২৪ ঘণ্টার প্রাকৃতিক চক্র কাজ করে, যা আমাদের কখন ঘুমাতে হবে এবং কখন জাগতে হবে তার সংকেত দেয়। সময়ের সাথে মিল রেখে খাবার খেলে শরীরের এই প্রাকৃতিক ঘড়িটি সঠিকভাবে কাজ করতে পারে।
আইএসগ্লোবাল-এর মহামারী সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ (এপিডেমিওলজিস্ট) লুসিয়ানা পনস-মুজ্জো বলেন, “আমাদের প্রাপ্ত ফলাফল অন্যান্য সাম্প্রতিক গবেষণার মতোই ইঙ্গিত করে যে, রাতে দীর্ঘ সময় উপবাস বা না খেয়ে থাকা ওজন নিয়ন্ত্রণে দারুণ সাহায্য করে। তবে এর জন্য শর্ত হলো—রাতের খাবার জলদি খেতে হবে এবং সকালের নাশতাও জলদি সারতে হবে।” তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, দিনের শুরুর দিকে খাবার খাওয়া আমাদের শরীরের সার্কাডিয়ান রিদমের সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে শরীর আরও ভালোভাবে ক্যালেরি পোড়াতে পারে এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে, যা শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখে।
গবেষক দলটি তাদের এই গবেষণায় বেশ কিছু উন্নত পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। নিখুঁত ফলাফলের জন্য তারা অংশগ্রহণকারীদের বয়স, ঘুমের অভ্যাস এবং জীবনযাত্রার অন্যান্য বিষয়গুলোকেও সমন্বয় করে নিয়েছেন। এতে দেখা গেছে, যারা দেরিতে সকালের নাশতা করেন এবং সারাদিনে ঘন ঘন খাবার খান, তাদের বিএমআই বেশি। অন্যদিকে, রাতে যারা দীর্ঘ সময় পেট খালি রাখেন বা উপবাস করেন, তাদের বিএমআই উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ইতিবাচক প্রভাবটি বিশেষ করে মেনোপজ বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পূর্ববর্তী বয়সের নারীদের (প্রিমেস্ট্রুয়াল উইমেন) মধ্যে বেশি স্পষ্ট আকারে দেখা গেছে।
অংশগ্রহণকারীদের খাবার অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা একটি ‘ক্লাস্টার অ্যানালিসিস’ বা গুচ্ছ বিশ্লেষণও করেন। এই প্রক্রিয়াটি গবেষণার মূল ফলাফলকে আরও স্পষ্ট করতে সাহায্য করেছে এবং এর মাধ্যমে ম্যাপিং অনুসারে নারী ও পুরুষের অভ্যাসগত পার্থক্য আলাদা করা সম্ভব হয়েছে। এই বিশ্লেষণে পুরুষদের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ গ্রুপ বা উপদল লক্ষ্য করা গেছে। এই গ্রুপের পুরুষেরা দুপুর ২টার পর তাদের দিনের প্রথম খাবার খেতেন এবং রাতে গড়ে প্রায় ১৭ ঘণ্টা না খেয়ে বা উপবাসে থাকতেন। দেখা গেছে, এই গ্রুপের পুরুষদের মধ্যে মদ্যপান ও ধূমপানের প্রবণতা বেশি ছিল এবং তাদের অনেকেই বেকার বা কর্মহীন ছিলেন।
আইএসগ্লোবাল-এর আরেকজন এপিডেমিওলজিস্ট কামিল লাসালে এই বিষয়ে বলেন, “আমরা পুরুষদের একটি উপদলের মধ্যে লক্ষ্য করেছি যে, তারা সকালের নাশতা বাদ দিয়ে এক ধরণের ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা সবিরাম উপবাস করছিলেন। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এই অভ্যাসের ফলে শরীরের ওজনের ওপর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।” তিনি আরও জানান, স্থূলতায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের নিয়ে করা অন্যান্য প্রতিরোধমূলক গবেষণাতেও দেখা গেছে যে, দীর্ঘ মেয়াদে ওজন কমাতে সকালের নাশতা বাদ দেওয়ার এই কৌশলটি সাধারণ ক্যালোরি কমানোর চেয়ে বেশি কার্যকর কিছু নয়।
যদিও এই গবেষণাটির কাঠামো সরাসরি কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক (কজ অ্যান্ড ইফেক্ট) প্রমাণ করে না, তবুও এর মধ্যকার যোগসূত্রগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যারা কেবল ক্যালোরি বাঁচানোর জন্য সকালের নাশতা এড়িয়ে চলছেন, তারা ভুল করছেন। গবেষকদের পরামর্শ হলো, সকালের নাশতা বাদ না দিয়ে বরং রাতের খাবারের সময় এগিয়ে আনা এবং সকালে দ্রুত নাশতা করে নেওয়া অনেক বেশি উপকারী হতে পারে।
আইএসগ্লোবাল-এর গবেষক আন্না পালোমার-ক্রস জানান, তাদের এই গবেষণাটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি উদীয়মান শাখা ‘ক্রোনোনিউট্রিশন’ (Chrononutrition)-এর অংশ। এই শাখায় কেবল আমরা কী খাচ্ছি তা-ই দেখা হয় না, বরং দিনের কোন সময়ে খাচ্ছি এবং কতবার খাচ্ছি তা নিয়েও বিস্তর আলোচনা করা হয়। মূলত, অস্বাভাবিক সময়ে খাবার গ্রহণ শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির নিয়মের পরিপন্থী, যা শরীরের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
গবেষকরা ধারণা করছেন, দীর্ঘ সময়ের রাতের উপবাস এবং সকালের দ্রুত নাশতার ফলে শরীরের ইনসুলিন উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং চর্বি জমার বিষয়টি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। তবে এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এর পাশাপাশি মানুষের ঘুমের প্যাটার্ন বা অভ্যাসও এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য, আর সঠিক সময়ে খাবার গ্রহণের অভ্যাস ভালো ঘুমে সহায়তা করে।
ভবিষ্যতে আরও বড় এবং বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘ সময় ধরে এই সংক্রান্ত গবেষণার পরিকল্পনা রয়েছে বিজ্ঞানীদের। ক্লিনিকাল ট্রায়ালের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের সুনির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়ার নির্দেশ দিয়ে শরীরে কী কী পরিবর্তন আসে, তা সরাসরি পরীক্ষা করা হবে।
সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু লাভের চাবিকাঠি কেবল দামি ডায়েট চার্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতির নিয়মের সাথে তাল মিলিয়ে চলাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে সহজ উপায়। তাই আজ থেকেই আপনার রাতের ডিনারের সময়টি এগিয়ে আনুন এবং সকালের নাশতা সঠিক সময়ে করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রকৃতির সাথে শরীরের এই মিতালিই আপনাকে দিতে পারে একটি মেদহীন ও রোগমুক্ত সুন্দর জীবন।
