আধুনিক জীবনযাত্রা এবং অনিয়ণ্ডিত জীবনযাপনের কারণে বিশ্বজুড়ে যে কয়েকটি ব্যাধি মহামারি আকার ধারণ করেছে, তার মধ্যে অন্যতম রক্তে উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল। এটি মানবদেহের রক্তনালীতে অলক্ষ্যে বাসা বেঁধে এক সময় ডেকে আনে মারাত্মক বিপর্যয়। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, কোনো কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা ওষুধ নয়, বরং প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সামান্য সচেতনতাই এই নীরব ঘাতককে রুখে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের সমস্যায় জর্জরিত। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, রক্তে এই চর্বির পরিমাণ বেড়ে গেলে তা ধমনীর ভেতরের দেয়ালে জমাট বাঁধতে শুরু করে। এর ফলে রক্তনালীগুলো সরু হয়ে যায় এবং রক্ত স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে না। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে করোনারি আর্টারি ডিজিজ, আকস্মিক হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের মতো মারাত্মক জীবনঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। তাই শরীরে বড় ধরনের কোনো জটিলতা তৈরি হওয়ার আগেই রক্তে চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। আর এর সবচেয়ে সহজ ও প্রাকৃতিক উপায় হলো সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা।
অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, কোলেস্টেরল কমাতে হলে সব ধরনের চর্বিযুক্ত খাবার পুরোপুরি বর্জন করতে হবে। কিন্তু পুষ্টিবিদদের মতে, চর্বি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর। আসল বিষয়টি হলো ক্ষতিকর চর্বি পরিহার করে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া এবং একটি সুষম খাদ্যতালিকা বজায় রাখা। সঠিক খাবার নির্বাচন করলে তা শরীর থেকে প্রাকৃতিকভাবেই ক্ষতিকর কোলেস্টেরল দূর করতে ভূমিকা রাখে।
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে খাদ্যের সরাসরি প্রভাব আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) এর জার্নালে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রার ওপর প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে আঁশযুক্ত খাবার এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাট রাখলে তা শরীরের জন্য উপকারী এইচডিএল (HDL) এবং ক্ষতিকর এলডিএল (LDL) কোলেস্টেরলের মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখে। একই সাথে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট এড়িয়ে চলা রক্তে চর্বির মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
রক্তের চর্বি শুষে নেয় দ্রবণীয় আঁশ হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে হলে দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় দ্রবণীয় আঁশ বা ফাইবারযুক্ত খাবারকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এই দ্রবণীয় আঁশ মানবদেহের পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে এক ধরণের আঠালো জেলের সৃষ্টি করে। এই জেল রক্তপ্রবাহে কোলেস্টেরল প্রবেশ করার আগেই সেগুলোকে নিজের সাথে আটকে ফেলে এবং মলত্যাগের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। ফলে নিয়মিত এই আঁশযুক্ত খাবার খেলে রক্তে ক্ষতিকর এলডিএল (LDL) কোলেস্টেরলের মাত্রা ক্রমান্বয়ে কমে আসে। এই বিশেষ আঁশের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে ওটস, বার্লি, বিভিন্ন রকমের শিম, মসুর ডাল, আপেল এবং বেরি জাতীয় ফল।
মৌসুমী ফল ও রঙিন সবজির পুষ্টি রক্তনালীকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে তাজা ফলমূল এবং শাকসবজির কোনো বিকল্প নেই। এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ উপাদান, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রাকৃতিক আঁশ থাকে, যা হৃদযন্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়ায়। ফল ও সবজিতে প্রাকৃতিকভাবেই ক্ষতিকর স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ক্যালরির পরিমাণ থাকে একদম কম। বিশেষ করে আপেল ও বেরি জাতীয় ফলে থাকা দ্রবণীয় আঁশ রক্ত পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া নিয়মিত ব্রকলি, গাজর, পালং শাকসহ বিভিন্ন রঙিন সবজি খেলে রক্তনালীর ভেতরের দেয়াল সুস্থ থাকে এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক হয়।
স্যাচুরেটেড ফ্যাট বর্জন ও স্বাস্থ্যকর তেলের ব্যবহার আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, সব চর্বি শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। রান্নায় অতিরিক্ত মাখন, ডালডা কিংবা ঘি ব্যবহার করার পরিবর্তে পরিমিত পরিমাণে স্বাস্থ্যকর উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করা উচিত। পুষ্টিবিদরা রান্নার জন্য খাঁটি সরিষার তেল ও চিনাবাদামের তেল ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এছাড়া দৈনন্দিন নাস্তায় চিপস বা বিсковুটের মতো অস্বাস্থ্যকর খাবারের বদলে এক মুঠো লবণবিহীন বাদাম বা বীজ খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো। সালাদ কিংবা স্যান্ডউইচে অ্যাভোকাডো যোগ করা যেতে পারে। বাদাম, বীজ এবং তৈলাক্ত মাছে প্রচুর পরিমাণে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, যা হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
অত্যধিক প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জনের তাগিদ বাজারের প্যাকেটজাত ও অত্যধিক প্রক্রিয়াজাত খাবারে উচ্চ মাত্রায় ক্ষতিকর চর্বি, অতিরিক্ত চিনি এবং লবণের মিশ্রণ থাকে। বেকারি পণ্য যেমন কেক, বিস্কুট, প্রক্রিয়াজাত মাংস, ফাস্ট ফুড এবং ডালডায় ভাজা খাবার নিয়মিত খেলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব দ্রুত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ফলে বাড়ে হৃদরোগের ঝুঁকি। এই ঝুঁকি এড়াতে প্যাকেটজাত খাবার বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি তাজা এবং ঘরে রান্না করা খাবার খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
প্রয়োজন সামগ্রিক সুষম খাদ্যতালিকা চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, অলৌকিকভাবে কোলেস্টেরল কমিয়ে দেবে এমন কোনো একক ‘সুপারফুড’ বা অলৌকিক খাবার পৃথিবীতে নেই। রক্তে চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার আসল রহস্য লুকিয়ে আছে প্রতিদিনের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ভেতর। সুস্থ ও দীর্ঘায়ু পেতে হলে খাদ্যতালিকায় লাল চালের ভাত বা আটা, ডাল, তাজা ফলমূল, সবুজ শাকসবজি, বীজ, বাদাম, চর্বিহীন প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বির একটি সুষম সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। একটি সুশৃঙ্খল জীবন ও সঠিক পুষ্টির চর্চায় সুস্থ রাখতে পারে আমাদের হৃদযন্ত্রকে।
