ক্যান্সার চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রচলিত এবং কষ্টদায়ক চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন—কেমোথেরাপি, অস্ত্রোপচার বা রেডিয়েশন ছাড়াই ক্যান্সার কোষ সম্পূর্ণ ধ্বংস করার এক অভিনব উপায় খুঁজে পেয়েছেন তারা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একে অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক একটি অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন এই চিকিৎসা পদ্ধতির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মলিকুলার জ্যাকহ্যামার’ বা আণবিক জ্যাকহ্যামার। এই পদ্ধতিতে মূলত আলো এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে বহুল ব্যবহৃত একটি সাধারণ অণুকে কাজে লাগানো হয়। চিকিৎসকরা এতে ব্যবহার করছেন ‘অ্যামিনোসায়ানাইন’ নামক এক ধরনের কৃত্রিম রং বা ডাই। এই উপাদানটি সাধারণত চিকিৎসাক্ষেত্রে শরীরের ভেতরের প্রতিচ্ছবি বা বায়োইমেজিং তৈরিতে আগে থেকেই ব্যবহার করা হয়ে আসছে।
বিজ্ঞানীরা এই অ্যামিনোসায়ানাইন অণুর ওপর বিশেষ ধরনের ‘নিয়ার-ইনফ্রারেড’ (অবরোহিত) আলো ফেলেন। এই আলোর সংস্পর্শে আসামাত্রই অণুগুলো একযোগে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কাঁপতে শুরু করে। এই কম্পনের গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন (৪০ লক্ষ কোটি) বার। তীব্র এই স্পন্দনের ফলে ক্যান্সার কোষের বাইরের আবরণ বা মেমব্রেনটি আক্ষরিক অর্থেই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
গবেষণাগারে দেখা গেছে, অত্যন্ত কম মাত্রার প্রক্ষেপেও এই পদ্ধতি মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ক্যান্সার কোষকে মেরে ফেলতে পারে। ২০২৩ সালের শেষের দিকে ‘নেচার কেমিস্ট্রি’ সাময়িকীতে এই গবেষণার প্রথম ফলাফল প্রকাশিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাইস ইউনিভার্সিটি, টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসের একদল বিজ্ঞানী যৌথভাবে এই পরীক্ষাটি চালিয়েছেন। ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে তৈরি ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি শতকরা ৯৯ ভাগ সফল হয়েছে। পাশাপশি, মেলানোমায় (ত্বকের ক্যান্সার) আক্রান্ত ইঁদুরের ওপর এটি প্রয়োগ করে দেখা গেছে, অর্ধেক ইঁদুরই সম্পূর্ণ ক্যান্সারমুক্ত হয়েছে।
এই সাফল্যের পর রাইস ইউনিভার্সিটির রসায়নবিদ জেমস ট্যুর এবং তার সহকর্মীরা এই প্রযুক্তির আরও বিস্তার ঘটান। ২০২৪ সালের শেষের দিকে ‘অ্যাডভান্সড সায়েন্স’ সাময়িকীতে তারা আরেকটি ফলো-আপ গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে বিজ্ঞানীরা জানান, তারা ইতিমধ্যে প্রায় ৭৫টি ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণের মলিকুলার জ্যাকহ্যামার তৈরি করছেন। এর ফলে বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারকে আরও নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব হবে।
রসায়নবিদ সিসেরন আয়ালা-অরোজকো এই বিষয়ে বলেন, এটি মূলত আণবিক স্তরে যান্ত্রিক শক্তি ব্যবহার করে ক্যান্সার নিরাময়ের একটি ভিন্নধর্মী প্রয়াস। এর আগে বিজ্ঞানীরা ‘ফেরিংগা-টাইপ মোটর’ নামের এক ধরনের অণু দিয়ে ক্ষতিকর কোষের গঠন ভেঙে দেওয়ার প্রযুক্তি তৈরি করেছিলেন। নতুন এই প্রযুক্তিটি আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। বিজ্ঞানী জেমস ট্যুরের মতে, এই নতুন প্রজন্মের আণবিক যন্ত্রগুলো আগের ফেরিংগা মোটরের চেয়ে প্রায় ১০ লক্ষ গুণ বেশি দ্রুত কাজ করতে পারে। এছাড়া আগেরগুলোতে দৃশ্যমান আলো দরকার হলেও নতুনটিতে নিয়ার-ইনফ্রারেড আলো ব্যবহার করা যায়।
চিকিৎসায় নিয়ার-ইনফ্রারেড আলোর ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই আলো মানুষের ত্বক ও মাংসপেশি ভেদ করে শরীরের প্রায় ৪ ইঞ্চি (১০ সেন্টিমিটার) গভীর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর ফলে হাড় কিংবা ভেতরের কোনো অঙ্গের ক্যান্সার নিরাময়ে বড় কোনো অস্ত্রোপচার ছাড়াই বাইরে থেকে আলো ফেলে চিকিৎসা করা সম্ভব হবে।
অ্যামিনোসায়ানাইন অণুর গঠন ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণে আলো পাওয়া মাত্রই এরা একসঙ্গে সক্রিয় হয়। অণুগুলো যখন কাঁপতে থাকে, তখন ভেতরের ইলেকট্রনগুলো সম্মিলিতভাবে এক ধরনের প্লাজমন তৈরি করে। এই প্লাজমনের একপাশে একটি হাতলের মতো অংশ থাকে। এই হাতলটি অণুগুলোকে ক্যান্সার কোষের আবরণের সাথে শক্তভাবে আটকে রাখতে সাহায্য করে এবং তীব্র কম্পনের মাধ্যমে আবরণটি ভেঙে ফেলে।
ইঁদুর এবং ল্যাব সংস্কৃতির বাইরে মানুষের শরীরে এর কার্যকারিতা কেমন হবে, তা নিয়ে এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তবে গবেষকরা একটি বড় আশার কথা শুনিয়েছেন। যেহেতু এটি কোনো রাসায়নিক ওষুধ নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ যান্ত্রিক প্রক্রিয়া, তাই ক্যান্সার কোষগুলোর পক্ষে এই চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা (রেজিস্ট্যান্স) গড়ে তোলা সম্ভব নয়। একই সাথে এর ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিষাক্ততার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, কম মাত্রার এই নিষ্ক্রিয় অণুগুলো সুস্থ কোষের কোনো ক্ষতি করে না এবং শরীর থেকে দ্রুত স্বাভাবিক নিয়মে বের হয়ে যায়।
ক্যান্সারের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াইয়ে এই আণবিক জ্যাকহ্যামার আগামী দিনে এক অপরাজেয় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। যদিও মানবদেহে এর চূড়ান্ত ট্রায়াল বা প্রয়োগ শুরু হতে আরও ৫ থেকে ৭ বছর সময় লাগতে পারে, তবুও বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার কোটি কোটি ক্যান্সার রোগীর মনে নতুন করে বেঁচে থাকার আলো দেখাচ্ছে।
