বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়া নিয়ে অনেকেই দুশ্চিন্তায় ভোগেন। তবে আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্স আশার বাণী শোনাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, মানুষের কিছু দৈনন্দিন ভুল অভ্যাস মস্তিষ্কের বুড়িয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে অনেক বেশি ত্বরান্বিত করে। অন্যদিকে, জীবনযাপনে সামান্য কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনে মগজকে দীর্ঘকাল তরুণ ও কর্মক্ষম রাখা সম্ভব। আমাদের অবহেলায় প্রতিনিয়ত মস্তিষ্কের ক্ষতি করছে এমন ১৬টি ক্ষতিকর অভ্যাস এবং তা থেকে মুক্তির উপায় নিচে আলোচনা করা হলো:
১. অপর্যাপ্ত ঘুম ও রাতের স্ক্রীন টাইম
নিয়মিত পর্যাপ্ত না ঘুমালে মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি হয়। ঘুমের সময় মস্তিষ্কের ‘গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম’ সারাদিনের জমে থাকা ক্ষতিকর টক্সিন বা বর্জ্য পরিষ্কার করে। এর মধ্যে ‘বিটা-অ্যামিলয়েড প্লেক’ অন্যতম, যা আলঝেইমার্স রোগের জন্য দায়ী। দৈনিক ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম না হলে এই বর্জ্য পরিষ্কার হতে পারে না। বিশেষ করে ঘুমানোর আগে মোবাইল বা কম্পিউটারের নীল আলো (ব্লু লাইট) মেললাটোনিন হরমোন উৎপাদনে বাধা দেয়, যা ঘুম নষ্টের অন্যতম কারণ।
- করণীয়: ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের স্ক্রীন থেকে দূরে থাকুন। শয়নকক্ষ অন্ধকার ও শান্ত রাখুন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
২. অলস জীবনযাপন ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অভ্যাস মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (ইউসিএলএ)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, অলস জীবনযাপনকারীদের মস্তিষ্কের স্মৃতি ধরে রাখার অংশটি পাতলা হয়ে যায়। পক্ষান্তরে, নিয়মিত ব্যায়াম মস্তিষ্কের মূল স্মৃতি কেন্দ্র ‘হিপোক্যাম্পাস’-এর আকার বৃদ্ধি করে।
- করণীয়: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ধরনের ব্যায়াম যেমন—হাঁটা, সাঁতার কাটা বা সাইকেল চালানোর অভ্যাস করুন।
৩. দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ
ক্রনিক স্ট্রেস বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণে শরীর থেকে ‘কর্টিসল’ হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন হিপোক্যাম্পাসের কোষ ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রমের ঝুঁকি বাড়ে।
- করণীয়: প্রতিদিন কিছুটা সময় মেডিটেশন, ইয়োগা বা প্রকৃতির মাঝে কাটানোর চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।
৪. প্রক্রিয়াজাত খাবার ও সকালের নাশকা না খাওয়া
অতিরিক্ত চিনি, অস্বাস্থ্যকর চর্বি এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার খেলে মস্তিষ্কে প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হয়। এটি গাড়ির ইঞ্জিনে বালু ঢালার মতো ক্ষতিকর। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর সকালে পুষ্টিকর নাশতা না পেলে মস্তিষ্ক গ্লুকোজের অভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং কর্মক্ষমতা হারায়।
- করণীয়: ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্যতালিকা বা ‘মাইন্ড ডায়েট’ অনুসরণ করতে পারেন। শাকসবজি, ফল, ওটস ও বাদাম জাতীয় পুষ্টিকর খাবার দিয়ে সকালের নাশতা সারুন।
৫. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব
মানুষ সামাজিক জীব। গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন বয়স্ক ব্যক্তিদের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি থাকে।
- করণীয়: বন্ধু ও পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখুন, বিভিন্ন সামাজিক বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে যুক্ত হন।
৬. অতিরিক্ত মাল্টিটাস্কিং
একসাথে অনেক কাজ বা মাল্টিটাস্কিং করলে মনোযোগ নষ্ট হয় এবং কাজের মান কমে। নিউরোসায়েন্টিস্ট ড্যানিয়েল লেভিটিনের মতে, মাল্টিটাস্কিং মস্তিষ্কে একটি ক্ষতিকর ‘ডোপামিন-অ্যাডিকশন ফিডব্যাক লুপ’ তৈরি করে, যা মনোযোগের ক্ষমতাকে চিরতরে কমিয়ে দেয়।
- করণীয়: যেকোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি মাত্র কাজে মনোযোগ দেওয়ার বা ‘সিঙ্গেল-টাঙ্কিং’-এর অভ্যাস করুন।
৭. শ্রবণশক্তি হ্রাস অবহেলা করা
কানের শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া ডিমেনশিয়ার একটি বড় ঝুঁকি। শুনতে সমস্যা হলে শব্দ প্রক্রিয়াজাত করতে মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত খাটতে হয়, যা অন্য মানসিক ক্ষমতাকে দুর্বল করে।
- করণীয়: কানের সমস্যায় অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করান এবং প্রয়োজনে হিয়ারিং এইড ব্যবহার করুন।
৮. পেটের স্বাস্থ্য বা গাট হেলথ উপেক্ষা করা
পাকস্থলী বা পেটকে মানুষের ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ বলা হয়। পেটের অণুজীব বা মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্য নষ্ট হলে তা সরাসরি মস্তিষ্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং স্মৃতিশক্তি দুর্বল করে।
- করণীয়: পেটের সুরক্ষায় ফাইবার যুক্ত খাবার এবং দই বা কিমচির মতো প্রোবায়োটিক খাবার বেশি খান।
৯. মানসিক উদ্দীপনার অভাব
মস্তিষ্ক এক ধরণের পেশির মতো—ব্যবহার না করলে এর কার্যকারিতা হারিয়ে যায়। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা মস্তিষ্কের ‘কগনিটিভ রিজার্ভ’ বা ক্ষয়পূরণ ক্ষমতা বাড়ায়।
- করণীয়: প্রতিদিন নতুন কোনো দক্ষতা অর্জন, বই পড়া, ধাঁধা সমাধান বা বাদ্যযন্ত্র বাজানোর মাধ্যমে মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখুন।
১০. অতিরিক্ত মদ্যপান ও ধূমপান
অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন মগজকে সংকুচিত করে। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত মদ্যপানও মানুষের মস্তিষ্ককে প্রায় দুই বছর বুড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে ধূমপান মস্তিষ্কের রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত করে স্ট্রোক ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়ায়।
- করণীয়: ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস সম্পূর্ণ ত্যাগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
১১. পানিশূন্যতা
মানব মস্তিষ্কের প্রায় ৭৫ শতাংশই পানি। সামান্য পানিশূন্যতাও মস্তিষ্কে ক্লান্তি ও মনোযোগহীনতা (ব্রেন ফগ) তৈরি করে।
- করণীয়: তৃষ্ণা না পেলেও সারাদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন। দৈনিক অন্তত ৮ গ্লাস পানি পানের লক্ষ্য থাকা উচিত।
১২. নেতিবাচক চিন্তাভাবনা
অনবরত ক্ষতিকর ও নেতিবাচক চিন্তা করার অভ্যাস মস্তিষ্কের আলঝেইমার্স রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এর বিপরীতে ঢাল হিসেবে কাজ করে।
- করণীয়: কৃতজ্ঞতাবোধ ও সচেতনতার চর্চা করুন। কোনো নেতিবাচক চিন্তা এলে তা ইতিবাচকভাবে ভাবার চেষ্টা করুন।
১৩. মাথায় আঘাত ও সুরক্ষার অভাব
ছোটখাটো বা মৃদু মাথার আঘাতও দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। পড়ে যাওয়া বা দুর্ঘটনার কারণে মগজের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
- করণীয়: সাইকেল চালানো বা খেলাধুলার সময় হেলমেট পরুন। গাড়িতে সিটবেল্ট ব্যবহার করুন এবং ঘরকে গুছিয়ে রাখুন যাতে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি না থাকে।
আমাদের সামগ্রিক সুস্থতা ও ব্যক্তিত্বের মূল চালিকাশক্তি হলো আমাদের মস্তিষ্ক। তাই বার্ধক্যের দোহাই দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে আজই আপনার ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো চিহ্নিত করুন। জীবনযাত্রার ছোট ছোট ইতিবাচক পরিবর্তনই ভবিষ্যতের একটি সুস্থ ও প্রাণবন্ত মনের নিশ্চয়তা দিতে পারে।
