ইউরোপজুড়ে সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন অন্তত পাঁচ ভাগ ফল বা শাকসবজি খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক জীবনযাত্রার নানা জটিলতায় সাধারণ মানুষ এই লক্ষ্য পূরণ করতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে ফলের রস (জুস) বা স্মুদি প্রতিদিনের ফলের ঘাটতি মেটাতে কতটা সাহায্য করতে পারে, তা নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এনেছেন গবেষকেরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, সুস্থ থাকতে একজন মানুষের প্রতিদিন অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও শাকসবজি খাওয়া উচিত। তবে ২০২৩ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইউরোপের মানুষ দৈনিক গড়ে মাত্র ৩৫১ গ্রাম ফল ও সবজি খেয়েছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশ কম। ফলের অতিরিক্ত দাম এবং দ্রুত পচে যাওয়ার ভয়ের কারণেই মূলত মানুষ পর্যাপ্ত ফল কেনা থেকে বিরত থাকেন। মানুষের এই ঘাটতি দূর করতে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক সম্প্রতি একটি বিশেষ গবেষণা পরিচালনা করেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল—ফলের রস বা স্মুদি দৈনিক পাঁচ ভাগের এক ভাগ ফলের চাহিদা পূরণ করতে পারে কি না, তা যাচাই করা।
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির পুষ্টি ও বার্ধক্যবিদ্যার শিক্ষক এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক ড. অলিভার শ্যানন জানান, যুক্তরাজ্যের বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জন্য তাজা ফলমূল কেনা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। দামের এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ফলের রস বা স্মুদি সাহায্য করতে পারলেও, স্বাস্থ্যকর ডায়েটে এর ভূমিকা নিয়ে পুষ্টিবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে।
গবেষণাটি ছোট পরিসরে হলেও এর ফলাফল বেশ আশাব্যঞ্জক। গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের তিনটি দলে ভাগ করেন। প্রথম দলকে চার সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন পাঁচটি আস্ত ফল ও সবজি খাওয়ানো হয়। দ্বিতীয় দলের প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় যোগ করা হয় ফলের রস। আর তৃতীয় দলকে তাদের স্বাভাবিক খাবার বজায় রাখতে বলা হয়। চার সপ্তাহ পর দেখা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় দলের সদস্যদের শরীরে ফল ও সবজি গ্রহণের পরিমাণ সাধারণ ডায়েট মেনে চলা তৃতীয় দলের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই গবেষণায় আরও একটি দারুণ তথ্য উঠে এসেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় দলের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশনের লক্ষণ অনেকটাই কমে গেছে। ড. শ্যানন বলেন, “ফলের রস পানের ফলে বিষণ্নতা কমে যাওয়ার এই বিষয়টি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রতিদিন এক গ্লাস ফলের রস দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে।” তবে এই গবেষণায় ‘ফলের রস’ বলতে শুধুমাত্র ১০০ ভাগ খাঁটি জুসকে বোঝানো হয়েছে, যাতে বাড়তি কোনো চিনি, প্রিজারভেটিভ, কৃত্রিম সুবাস বা রঙ মেশানো হয়নি।
গবেষণার সহ-লেখক ড. কোর্টনি নিলের মতে, যাদের ফল খাওয়ার পরিমাণ কম, তাদের যদি সঠিক আর্থিক ও শিক্ষামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়, তবে তারা খাদ্যাভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন। প্রতিদিন এক গ্লাস খাঁটি ফলের রস বা স্মুদির মতো সহজ ও সাশ্রয়ী উপায় মানুষকে দৈনিক ফলের চাহিদা পূরণে সাহায্য করে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।
তবে ফলের রসের এমন উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশের জাতীয় খাদ্য নির্দেশিকায় এ নিয়ে বেশ সতর্কতা রয়েছে। গবেষকেরা দেখেছেন, যারা জুস পান করেন তারা অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণে তা পান করে ফেলেন। অথচ দৈনিক কতটুকু জুস খাওয়া উচিত, তা নিয়ে দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম রয়েছে। যেমন—২০১৭ সালে খাদ্য নির্দেশিকা পরিবর্তনের পর ফ্রান্সে ফলের রসকে দৈনিক ফল গ্রহণের অংশ হিসেবে গণ্যই করা হয় না। জার্মানি সপ্তাহে সর্বোচ্চ দুই বার আস্ত ফলের পরিবর্তে ১৫০ থেকে ২০০ মিলি জুস খাওয়ার পরামর্শ দেয়। যুক্তরাজ্যে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৫০ মিলি ফলের রস খাওয়ার নিয়ম রয়েছে, যা তাদের দৈনিক পাঁচ ভাগের এক ভাগ ফলের সমান। অন্যদিকে ডেনমার্ক দৈনিক পাঁচ ভাগের বদলে ছয় ভাগ ফল খাওয়ার কথা বলে এবং এক গ্লাস জুসকে এর অংশ মনে করে। তবে সব দেশই এক বিষয়ে একমত যে, জুসের চেয়ে আস্ত ফল খাওয়াই সবচেয়ে শ্রেয়।
পুষ্টিবিদদের মতে, আস্ত ফলের তুলনায় জুসে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকে এবং ফাইবারের (আঁশ) পরিমাণ থাকে খুবই কম। আস্ত ফল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হজমে সাহায্য করে এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু ফল থেকে জুস তৈরি করার সময় এই দরকারি উপাদানগুলোর বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে যায়। পূর্ববর্তী বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত অতিরিক্ত জুস পানের ফলে শরীরে শক্তির মাত্রা কমে যেতে পারে এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। কারণ জুস পানের পর পেট ও মন আস্ত ফলের মতো তৃপ্ত হয় না।
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ফলের রস কখনোই আস্ত ফলের বিকল্প হতে পারে না। ব্যস্ত জীবনে বা ফলের দামের কথা চিন্তা করে সাময়িকভাবে জুস বা স্মুদিকে তালিকায় রাখা যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ শরীর ও সতেজ মনের জন্য প্রক্রিয়াজাত জুস এড়িয়ে সরাসরি তাজা ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
