সন্তানকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মা-বাবার জন্যই এক বড় মানসিক চাপ। সমসাময়িক পারিবারিক আড্ডা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্যারেন্টিং গ্রুপে চোখ রাখলেই একটি চিরচেনা হাহাকার চোখে পড়ে। তা হলো—শিশুরা ভাত, আলু কিংবা নুডলসের মতো নির্দিষ্ট কিছু খাবার ছাড়া আর কিছুই মুখে তুলতে চায় না। বিশেষ করে থালায় সবুজ শাকসবজি দেখলে তাদের কান্নাকাটি কিংবা ঘর মাথায় তোলার দৃশ্য ঘরে ঘরে দেখা যায়। অনেক অভিভাবক নিরুপায় হয়ে বকাঝকা, মারধর বা জোর করার পথ বেছে নেন। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ববিদরা বলছেন, এই জোরজবরদস্তির ফল উল্টো হতে পারে। এতে শিশুর মনে সবজির প্রতি চিরতরে ভয় ও এক ধরনের স্থায়ী অনীহা তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মগতভাবেই শিশুদের জিহ্বায় মিষ্টি স্বাদের প্রতি তীব্র ঝোঁক থাকে। ফলে তিতা বা কড়া স্বাদের করলা, পুঁইশাক বা ব্রকলির মতো সবজি প্রথম দেখায় তাদের মুখে রোচে না। কিন্তু এই অনীহার কারণে যদি শিশুর প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা থেকে শাকসবজি বাদ পড়ে, তবে তার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শরীরে। এটি সরাসরি শিশুর বুদ্ধিমত্তা বিকাশ, মনোযোগের ক্ষমতা এবং পড়াশোনার দক্ষতার ওপর বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই জটিল সমস্যার সমাধানে গবেষকরা জোর করার চেয়ে কৌশলী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বিজ্ঞান বলছে, প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনলেই শিশুরা কোনো জোর ছাড়াই নিজে থেকে সবজি খাওয়া শুরু করবে। বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত এমনই ৬টি বিজ্ঞানসম্মত ট্রিকস নিচে তুলে ধরা হলো:
১. পাঁচ বছর বয়সের আগেই শুরু হোক পরিচিতি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লিডসের গবেষকদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাচ্চার বয়স ৫ বছর পার হওয়ার আগেই তাকে যত বেশি সম্ভব নানা পদের সবজির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া উচিত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ফ্রিকোয়েন্ট এক্সপোজার’। এর সহজ মানে হলো, শিশুর চোখের সামনে বারবার সবজি নিয়ে আসা। গবেষণা বলছে, যেকোনো নতুন খাবারকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে একটি শিশুর ৫ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। তাই প্রথম কয়েকবার শিশু খেতে না চাইলে কোনোভাবেই হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
২. ক্ষুধা যখন তুঙ্গে, সবজি দিন সবার আগে সাধারণত বাঙালি মায়েরা শিশুকে টেবিলে বসিয়ে প্রথমেই প্লেটে ভাত, মাছ কিংবা মাংস পরিবেশন করেন। এরপর পেট যখন প্রায় ভরে আসে, তখন সবজি মুখে দিতে চান। বিজ্ঞান বলছে, এই নিয়মটি সম্পূর্ণ উল্টো করা উচিত। শিশু যখন ভীষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় খেতে বসে, তখন তার ক্ষুধা থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ঠিক এই সময়ে প্লেটে সবার আগে সবজি বা সবজি দিয়ে তৈরি কোনো হালকা সুস্বাদু পদ দিন। ক্ষুধার তাড়নায় তারা অনায়াসেই সবজিটা আগে সাবাড় করে দেবে। এছাড়া সকালের ডিমের ওমেলেটে মাশরুম বা পালং শাক কুচি মিশিয়েও শুরুতেই পুষ্টি নিশ্চিত করা সম্ভব।
৩. মাংসের আড়ালে সবজি লুকানোর কৌশল যদি কোনো শিশু আলাদাভাবে সবজি একেবারেই স্পর্শ করতে না চায়, তবে রান্নার পরিমাপের অনুপাতে কিছুটা বদল আনুন। নুডলস, পাস্তা কিংবা চিকেন কারি তৈরির সময় মাংসের পরিমাণ সামান্য কমিয়ে দিন। সেই জায়গায় গাজর, বরবটি বা পেঁপে একদম মিহি কুচি করে সস বা ঝোলের সাথে এমনভাবে মিশিয়ে দিন যাতে আলাদা করে চেনা না যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্লেটে পছন্দের খাবারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর উপাদানের পরিমাণ ৫০% বাড়িয়ে দিলে বাচ্চার অজান্তেই শরীরে সবজি যাওয়ার পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।
৪. পরিবেশন ও কাটার ধরনে আনুন রঙের টুইস্ট যেকোনো মানুষই মুখে খাবার দেওয়ার আগে সেটি চোখ দিয়ে দেখে উপভোগ করে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই দৃশ্যমান আকর্ষণ আরও বেশি কাজ করে। তাই সবজি কাটার সময় সাধারণ গোল বা চৌকো না কেটে কিছুটা সৃজনশীল হোন। গাজর, শসা বা টমেটো যদি প্রজাপতি, ফুল কিংবা কোনো কার্টুন চরিত্রের (যেমন মিকি মাউস) আকৃতিতে কেটে প্লেটে সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা শিশুর কাছে খেলার ছলে অত্যন্ত আকর্ষণীয় মনে হবে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, প্লেটের ভিন্ন ভিন্ন খোপে আলাদা আলাদা রঙের সবজি সাজিয়ে রাখলে প্রি-স্কুলের শিশুরা সাধারণের চেয়ে ৩৬% বেশি সবজি গ্রহণ করে।
৫. পুরো পরিবার একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস শিশুরা স্বভাবগতভাবেই অনুকরণপ্রিয়; তারা পরিবারের বড়দের যা করতে দেখে, অবিকল সেটাই শেখে। বাবা-মা নিজেরা যদি নিয়মিত ফাস্টফুড, কোল্ড ড্রিংকস বা অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার খান এবং শিশুকে জোর করে সবজি খাওয়াতে চান, তবে সেই চেষ্টা কখনোই সফল হবে না। এজন্য সপ্তাহে অন্তত ৩ দিন পুরো পরিবার একসাথে বসে খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। বড়রা যখন নিজেরা তৃপ্তি সহকারে শাকসবজি খাবেন, তখন তা দেখে শিশুর মনেও সেই খাবারের প্রতি এক ধরনের কৌতূহল, ভরসা ও ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি হবে।
৬. রান্নার কাজে অংশীদারিত্ব ও ‘সেন্সরি প্লে’ বিজ্ঞানসম্মত আরেকটি দারুণ উপায় হলো খাবার নিয়ে শিশুদের ‘সেন্সরি প্লে’ বা হাত দিয়ে ছুঁয়ে খেলার সুযোগ দেওয়া। এতে নতুন খাবারের প্রতি তাদের মনের ভয় বা জড়তা কেটে যায়। রান্না করার সময় ছোট ছোট নিরাপদ কাজে শিশুকে সঙ্গে রাখুন। যেমন—সবজি ধুয়ে দেওয়া কিংবা বাছতে সাহায্য করা। কাঁচা গাজর, ক্যাপসিকাম বা টমেটো তাদের হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে দিন, ঘ্রাণ নিতে বলুন। কোনো ধরনের খাওয়ার চাপ না রেখে ফ্রেশ মুডে যখন তারা সবজি নিয়ে নাড়াচাড়া করবে, তখন ধীরে ধীরে সেটির স্বাদ নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি তাদের ভেতর নিজে থেকেই তৈরি হবে।
পরিশেষে বলা যায়, শিশুর খাদ্যাভ্যাস একদিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধৈর্যসাপেক্ষ প্রক্রিয়া। ধমক বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে হয়তো কিছুটা খাওয়ানো সম্ভব, কিন্তু তাতে পুষ্টির চেয়ে শিশুর মানসিক বিকাশই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই দৈনন্দিন জীবনের এই সাধারণ বিজ্ঞানসম্মত কৌশলগুলো প্রয়োগ করে আনন্দের মধ্য দিয়ে শিশুর থালায় পুষ্টিকর খাবার তুলে দেওয়াই হবে প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
