কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (ডিআরসি) এবং উগান্ডায় ইবোলা ভাইরাসের নতুন প্রাদুর্ভাব বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ১৫ মে কিনশাসা আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের ১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাবের ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে অঞ্চলটিতে ‘বুন্দিবুগিও’ নামক একটি বিশেষ স্ট্রেইনের কারণে ৯০০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ২০০ জনেরও বেশি মানুষ। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কঙ্গোর জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন ‘উচ্চ’ থেকে ‘অত্যন্ত উচ্চ’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে। তবে বৈশ্বিক ঝুঁকি এখনো ‘নিম্ন’ পর্যায়েই রাখা হয়েছে। ইবোলা সংক্রমণ প্রতিরোধে আক্রান্ত দেশগুলোর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও জীবাণুনাশক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
আক্রান্ত দেশগুলোর কঠোর সীমান্ত ও যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ
ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে আক্রান্ত দেশগুলো নিজেদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এই সপ্তাহে কঙ্গোর পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর বুনিয়া থেকে সব ধরনের বিমান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে দেশের যে ১১টি স্বাস্থ্য অঞ্চলে ইবোলার প্রকোপ দেখা গেছে, বুনিয়া তার অন্যতম। তবে মানবিক সাহায্য, চিকিৎসা ও জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত ফ্লাইটগুলো বিশেষ অনুমতি নিয়ে চলাচল করতে পারবে। অন্যদিকে, উগান্ডাও কঙ্গোর সঙ্গে তাদের সীমান্ত ও ভ্রমণ নীতি কঠোর করেছে। দেশ দুটির মধ্যকার সব সরাসরি ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাস ও নৌকায় সীমান্ত পারাপার আগামী চার সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। নিয়মিত সীমান্ত হাটগুলো স্থগিত করা হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, খাদ্য ও পণ্যবাহী পরিবহনের চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে একের পর এক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা
বুন্দিবুগিও স্ট্রেইনের বিস্তার রোধ করতে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ কঙ্গো ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর অস্থায়ী ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কানাডা ও বাহামাস সরকার কঙ্গো, উগান্ডা এবং দক্ষিণ সুদানের নাগরিকদের প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আগামী ২৭ মে থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের জন্য এই তিন দেশের নাগরিকরা কানাডায় প্রবেশ করতে পারবেন না। এছাড়া কানাডার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিজ দেশের নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দারা যদি সাম্প্রতিক সময়ে আক্রান্ত এলাকাগুলো ভ্রমণ করে থাকেন, তবে ৩০ মে থেকে তাদের ২১ দিন বাধ্যতামূলক স্ব-বিচ্ছিন্নতা বা কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। বাহামাস সরকারও এই তিন দেশের নাগরিকদের ওপর ৩০ দিনের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যা অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বিগত ২১ দিনের মধ্যে কঙ্গো, উগান্ডা বা দক্ষিণ সুদান ভ্রমণকারী অ-মার্কিন নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। গত ২২ মে থেকে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় গ্রিন কার্ডধারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছে মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC)। যেসব মার্কিন নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো থেকে ফিরছেন, তাদের সুনির্দিষ্ট ৩টি বিমানবন্দরে বিশেষ স্ক্রিনিংয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিমানবন্দরগুলো হলো— ওয়াশিংটন ডুলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হার্টসফিল্ড-জ্যাকসন আটলান্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং জর্জ বুশ ইন্টারকন্টিনেন্টাল বিমানবন্দর। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন কেনিয়াতে মার্কিন জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের একটি দল পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এই কর্মকর্তারা সেখানে কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র স্থাপন করে আক্রান্ত বা উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা মার্কিন নাগরিকদের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের কাজ করবেন। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডান ও বাহরাইনও কঙ্গো, উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদান থেকে আসা বিদেশি পর্যটকদের প্রবেশে ৩০ দিনের স্থগিতাদেশ জারি করেছে। তবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া এই দেশগুলোর কোনোটিতেই এখন পর্যন্ত ইবোলার কোনো রোগী পাওয়া যায়নি।
এশিয়া ও মেক্সিকোতে জোরদার স্ক্রিনিং ব্যবস্থা
আফ্রিকায় ইবোলার এই বিস্তারের প্রভাবে এশিয়ার দেশগুলোও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ভারত তাদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে অতিরিক্ত স্ক্রিনিং ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে। সেই সঙ্গে ভারতীয় নাগরিকদের কঙ্গো, উগান্ডা এবং দক্ষিণ সুদানে ভ্রমণ না করার জন্য একটি বিশেষ ভ্রমণ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে নয়াদিল্লিতে এই সপ্তাহে নির্ধারিত ‘ভারত-আফ্রিকা শীর্ষ সম্মেলন’ স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিড়াল জোটের (International Big Cat Alliance) একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকও বাতিল করেছে ভারত। বড় সাতটি বিড়াল প্রজাতির প্রাণী (বাঘ, সিংহ, চিতাবাঘ, তুষার চিতা, জাগুয়ার, মেঘলা চিতা ও পুমা) সংরক্ষণে গঠিত ৯৫টি দেশের এই জোটের একটি বড় অংশই আফ্রিকার সদস্য দেশ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড জানিয়েছে, কঙ্গো ও উগান্ডা থেকে আসা যাত্রীদের ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ করতে হলে অবশ্যই ল্যান্ডিং-পরবর্তী স্ক্রিনিং পরীক্ষায় নেগেটিভ হতে হবে। অন্যদিকে, মেক্সিকোর স্বাস্থ্যমন্ত্রীও ২৫ মে বিমানবন্দরগুলোতে ইবোলা শনাক্তকরণ পরীক্ষা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
বিমান ভ্রমণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা
বিশ্বব্যাপী সীমান্ত বন্ধের এই হিড়িকের মাঝে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO) সদস্য দেশগুলোকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলোকে নিরাপদ উল্লেখ করে দেশগুলোকে ঢালাওভাবে সীমান্ত বন্ধ না করার অনুরোধ করেছে। আইসিএও-এর মতে, যাত্রীদের পৌঁছানোর পর পরীক্ষা করার চেয়ে যাত্রার আগেই স্ক্রিনিং করা বেশি কার্যকর। তারা বিমান সংস্থা ও সরকারগুলোকে কোভিড-১৯ মহামারীর সময়কার প্রতিরোধ বিধিমালা, যেমন— ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য ঘোষণা এবং সরাসরি সংস্পর্শ পরিহারের মতো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে যেসব যাত্রীর জ্বর বা সন্দেহভাজন লক্ষণ রয়েছে, তাদের উড্ডয়নের আগেই আটকে দেওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করতে বলা হয়েছে।
বুন্দিবুগিও স্ট্রেইনের বৈশিষ্ট্য ও ভয়াবহতা
উগান্ডার বুন্দিবুগিও প্রদেশের নামানুসারে এই স্ট্রেইনটির নামকরণ করা হয়, যেখানে ২০০৭-২০০৮ সালে এটি প্রথম মানবদেহে শনাক্ত হয়েছিল। মানুষের শরীরে প্রাণঘাতী রোগ তৈরি করতে সক্ষম ইবোলা ভাইরাসের প্রধান চারটি স্ট্রেইনের একটি হলো এই বুন্দিবুগিও। বৈশ্বিক গবেষণা অনুযায়ী, এই স্ট্রেইনে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুর হার ৩০% থেকে ৪০%। এটি ইবোলার অপর মারাত্মক রূপ ‘জায়ার স্ট্রেইন’ (Zaire strain)-এর চেয়ে কম বিপজ্জনক, কারণ জায়ার স্ট্রেইনে মৃত্যুর হার ৯০% পর্যন্ত হতে পারে।
জেনেটিক বা বংশগত গঠনের পার্থক্যের কারণে বুন্দিবুগিও স্ট্রেইনের তীব্রতা, সংক্রমণ ক্ষমতা ও চিকিৎসা পদ্ধতি জায়ার স্ট্রেইনের চেয়ে আলাদা। বুন্দিবুগিও মানবদেহে প্রবেশ করে জায়ার স্ট্রেইনের চেয়ে ধীর গতিতে বংশবৃদ্ধি করে। এটি মানুষের রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলোকে ধ্বংস করতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়, যার ফলে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ে। তবে উভয় স্ট্রেইনের সুপ্তিকাল (Incubation Period) প্রায় এক, যা গড়ে ৮ থেকে ১০ দিন হলেও কখনো কখনো ২১ দিন বা ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বুন্দিবুগিও স্ট্রেইন রোগীর যকৃৎ (লিভার) এবং বৃক্কের (কিডনি) ওপর জায়ার স্ট্রেইনের তুলনায় কম ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
সাধারণভাবে, ইবোলা আক্রান্ত প্রাণী বা মানুষের শরীরের যেকোনো তরল (যেমন— রক্ত, লালা বা ঘাম) এবং এই তরল লেগে থাকা বস্তুর সরাসরি সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাস ছড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আক্রান্ত ব্যক্তির শুরুতে ফ্লু-এর মতো লক্ষণ দেখা দেয়। যেমন— তীব্র জ্বর, ক্লান্তি, শরীর ও পেশী ব্যথা, মাথাব্যথা এবং গলা ব্যথা। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বমি ও ডায়রিয়া শুরু হয় এবং শেষ পর্যায়ে শরীরের ভেতরে ও বাইরে রক্তপাত এবং একাধিক অঙ্গ বিকল (মাল্টিপল অর্গান ফেইলিউর) হতে পারে।
প্রতিষেধক আবিষ্কারের জরুরি প্রতিযোগিতা ও বর্তমান চিকিৎসা
কঙ্গো এবং উগান্ডায় রোগটি নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা বুন্দিবুগিও স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর টিকা তৈরির জন্য জরুরি গবেষণায় নেমেছেন। বর্তমানে বাজারে থাকা ইবোলার টিকাগুলো মূলত অন্য স্ট্রেইনের জন্য তৈরি। অতীতে বুন্দিবুগিও বড় আকারে না ছড়ানোর কারণে এটি নিয়ে গবেষণা কম হয়েছে। তবে বর্তমানে বেশ কিছু পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন ও ওষুধ বানর জাতীয় প্রাণীর ওপর প্রয়োগ করে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— মার্ক-এর ‘এরভেবো’ ভ্যাকসিন, ম্যাপ বায়োফার্মাসিউটিক্যালস-এর ‘এমবিপি ১৩৪’ এবং অরো ভ্যাকসিনস-এর ‘ভেসিকুলোভ্যাক্স’ ভ্যাকসিন।
এদিকে, ‘ন্যানোভাইরিসাইডস’ নামের একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে যে, তাদের তৈরি পরীক্ষামূলক অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ‘এনভি-৩৮৭’ (NV-387) এই নতুন স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। এই ওষুধটি মূলত মাঙ্কিপক্স বা এমপক্সের চিকিৎসার জন্য ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রয়েছে। ওষুধটি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধকারী কোষের প্রোটিনকে অনুকরণ করে তৈরি, যার ফলে ইবোলা ভাইরাস আসল কোষে আক্রমণ না করে এই ওষুধটিকে ‘টোপ’ হিসেবে গ্রহণ করে এবং সুস্থ কোষে ছড়াতে পারে না। এছাড়া প্রাথমিক গবেষণায় চীনে তৈরি একটি mRNA ভ্যাকসিন গবেষণাগারে ইঁদুরের ওপর আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে, যদিও এটি এখনো বড় প্রাণীদের ওপর পরীক্ষা করা হয়নি।
লন্ডন স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিনের ড. ড্যানিয়েলা মানো মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো সুনির্দিষ্ট অনুমোদিত ওষুধ না থাকায় প্রচলিত জনস্বাস্থ্যমূলক পদক্ষেপগুলোই সবচেয়ে বড় ভরসা। দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ, আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্নকরণ, আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসাদের খুঁজে বের করা (কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং), নিরাপদ দাফন এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার মাধ্যমেই এই মহামারী রুখে দেওয়া সম্ভব। এই পদ্ধতিগুলোই ২০১৪-২০১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ইবোলা মহামারী নিয়ন্ত্রণে সফল ভূমিকা রেখেছিল। বর্তমান প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণেও এই পদক্ষেপগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।
