ব্রেক-আপের পর হঠাৎ একজিমার তীব্রতা বেড়ে যাওয়া কিংবা ঘর বদলানোর ক্লান্তিকর সময়ে মুখে ব্রণ দেখা দেওয়া—কোনোটিই আসলে কাকতালীয় বিষয় নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মানুষের মন ও ত্বকের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। দৈনন্দিন জীবনের মানসিক চাপ বা ‘স্ট্রেস’ কেবল মনের শান্তিই কেড়ে নেয় না, বরং তা সরাসরি আঘাত হানে আমাদের ত্বকে। চিকিৎসকদের মতে, মানসিক অবসাদ বা অতিরিক্ত উদ্বেগের কারণেই ব্রণ, একজিমা, সোরিয়াসিস বা আমবাতের মতো চর্মরোগ নতুন করে দেখা দেয় কিংবা পুরনো রোগের প্রকোপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, মানবদেহের গঠন প্রক্রিয়ার শুরুতেই লুকিয়ে আছে এই রহস্য। মূলত ভ্রূণাবস্থায় একই কোষগুচ্ছ থেকে মানুষের মস্তিষ্ক এবং ত্বকের বিকাশ ঘটে। ফলে এই দুইয়ের মধ্যে আজীবন একটি নিবিড় সংযোগ রয়ে যায়। যখনই কোনো ব্যক্তি মানসিক চাপ অনুভব করেন, তখন মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ অংশটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই অংশটি আদিম আবেগের সাথে যুক্ত। অ্যামিগডালা তখন মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ‘হাইপোথ্যালামাস’-এ সংকেত পাঠায়। এর ফলে শরীরের গ্রন্থিগুলো কর্টিসল (যা স্ট্রেস হরমোন নামে পরিচিত) এবং অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন নিঃসরণ শুরু করে। এই হরমোন ও রাসায়নিক উপাদানগুলো রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেহের অভ্যন্তরে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি করে, যা ত্বকের রোগকে আরও জটিল করে তোলে।
লন্ডনের প্রখ্যাত সাইকোডার্মাটোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. আলিয়া আহমেদ এই বিষয়ে বলেন, “শারীরিক এবং মানসিক—উভয় ধরনের চাপই মানুষের ত্বকের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।” ‘সাইকোডার্মাটোলজি’ হলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের এমন এক উদীয়মান ক্ষেত্র, যেখানে মন ও ত্বককে একত্রে বিবেচনা করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এই খাতের বিশেষজ্ঞরা চর্মরোগের বাহ্যিক লক্ষণ দেখার পাশাপাশি রোগীর মন-মেজাজ, উদ্বেগ, ঘুমের ধরণ, খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের রুটিনও খতিয়ে দেখেন।
চিকিৎসকরা জানান, অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর বা ব্যারিয়ার দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ত্বক তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা হারায়। আর্দ্রতাহীন ত্বকে বাইরের পরাগরেণু, ধূলিকণা বা সুগন্ধির মতো অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদান সহজেই প্রবেশ করে ত্বককে সংবেদনশীল ও শুষ্ক করে তোলে। একই সাথে শরীরে প্রাকৃতিকভাবে জীবাণু ধ্বংসকারী ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইড’-এর মাত্রা কমে যায়। ফলে ত্বক সুরক্ষাহীন হয়ে পড়ে এবং জ্বরঠোসা কিংবা দাদের মতো সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অন্যদিকে, মানসিক চাপের ফলে নিঃসৃত হরমোন ত্বকের সেবাসিয়াস গ্ল্যান্ড বা তৈলগ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে অতিরিক্ত ‘সিবাম’ (তৈলাক্ত পদার্থ) তৈরি করে। এই সিবাম লোমকূপ বন্ধ করে দেয়, যা ব্রণের প্রধান কারণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক চাপ ত্বকে ‘হিস্টামিন’ নামক রাসায়নিক নিঃসরণ ঘটায়, যা তীব্র চুলকানির অনুভূতি তৈরি করে। ডা. আলিয়া আহমেদ একে ‘ইচ-স্ক্র্যাচ সাইকেল’ বা চুলকানির দুষ্টচক্র বলে আখ্যায়িত করেছেন। ত্বকে চুলকানি হলে মানুষ চুলকায়, ফলে ত্বক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চুলকানি আরও বেড়ে যায়। এই অবস্থায় রোগী নিজের ওপর বিরক্ত হন, যা তার মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে দেয় এবং রোগটি চক্রাকারে জটিল হতে থাকে। একজিমার রোগীদের ক্ষেত্রে এই চক্র জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
তাহলে এই সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় কী? ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা ও স্নায়ুবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রজিতা সিন্হা জানান, মানসিক চাপ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন মাথাব্যথা, পেটের সমস্যা, খিটখিটে মেজাজ বা অনিদ্রা দেখা দেয়। এই অবস্থা থেকে বাঁচতে তিনি নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ও ‘মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন’ বা সচেতন ধ্যান করার পরামর্শ দেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ব্যায়াম কর্টিসলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। আর মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন মস্তিষ্কের ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অংশকে উন্নত ও পুরু করে, যা মানুষের যুক্তিবোধ ও মানসিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সোরিয়াসিস রোগে আক্রান্ত যে রোগীরা প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি মাইন্ডফুলনেস থেরাপি নিয়েছেন, তারা অন্যদের চেয়ে দ্রুত সুস্থ হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মানসিক চাপ কমানোর জন্য ওয়াকিং মেডিটেশন (ধীর গতিতে হেঁটে পায়ের অনুভূতির ওপর মনোযোগ দেওয়া), বিছানায় হালকা ব্যায়াম বা বর্তমান মুহূর্তে মনকে ফিরিয়ে আনার বিভিন্ন কৌশল অনুসরণের পরামর্শ দেন। তবে ডা. আহমেদ সতর্ক করে বলেন, বাস্তবে আরাম বা রিল্যাক্স করাটা অনেকের জন্য কঠিন হয়। অনেক কঠোর পরিশ্রমী মানুষ সন্তান বা বয়স্ক মা-বাবার যত্ন নেওয়ার দৈনন্দিন মানসিক চাপ মাথায় নিয়েই জিমে যান বা হাঁটাহাঁটি করেন। কিন্তু সুস্থতার জন্য ওই সময়ে মনকেও পুরোপুরি বিশ্রাম দিতে হবে।
ত্বক ও মনের এই জটিল সমস্যার সমাধানে কেবল মানসিক চাপ কমালেই চলবে না, পাশাপাশি ত্বকের সঠিক যত্ন ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে হবে। চিকিৎসকদের মতে, সাইকোডার্মাটোলজি অনুসরণের মাধ্যমে রোগীরা কেবল চর্মরোগ থেকেই মুক্তি পাচ্ছেন না, বরং তাদের সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যেরও অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটছে।
