ব্যস্ত জীবনযাত্রা, অতিরিক্ত কাজের চাপ কিংবা দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইলের স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা—বর্তমান যুগে ক্লান্তি আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। আর এই অবসাদ দূর করতে অধিকাংশ মানুষই বেছে নেন এক কাপ গরম চা বা কফি। কিন্তু অতিরিক্ত চা-কফি পানের অভ্যাস শরীরের জন্য মোটেও মঙ্গলজনক নয়। চিকিৎসকদের মতে, ক্যাফেইনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দূর করে দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমেই সারাদিন নিজেকে চনমনে ও সতেজ রাখা সম্ভব।
১. ক্লান্তি দূর করতে পানির বিকল্প নেই শরীরে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন তৈরি হলে সবার আগে ক্লান্তি ভর করে। অবসন্ন ভাব দেখা দিলে চা-কফির খোঁজে না ছুটে প্রথমেই এক গ্লাস পানি পান করা উচিত। চা বা কফি খেলে ঘন ঘন প্রস্রাব হয়, যা শরীর থেকে তরল বের করে দেয় এবং পানির ঘাটতি তৈরি করে। এই ঘাটতির কারণে কিছু সময় পর আবারও ক্লান্তি জেঁকে বসে। ফলে মানুষ বারবার চা-কফি পান করে, যা এক ধরনের ক্ষতিকর চক্র তৈরি করে। এই চক্র ভাঙতে নিয়মিত পানি পানের অভ্যাস করা জরুরি।
২. খাদ্য তালিকায় রাখুন স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস ক্লান্তির আরেকটি বড় কারণ শরীরে ভিটামিন ‘বি’-র অভাব। শাকসবজি রান্নার সময় বাষ্পের সাথে এই ভিটামিনটি নষ্ট হয়ে যায়। তাই শরীরে ভিটামিন ‘বি’-র জোগান দিতে রোজ সামান্য পরিমাণে হলেও কাঁচা সবজির সালাদ খাওয়া প্রয়োজন। এই সালাদকে সুস্বাদু করতে এর সাথে সেদ্ধ ডিম, মাংস কিংবা হালকা সেদ্ধ সবজি মেশানো যেতে পারে। এছাড়া বিকেলের নাশতায় ফাস্টফুড, চিনি, সাদা ভাত বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে চিনা বাদাম, কাঠবাদাম বা বিভিন্ন পুষ্টিকর বীজ খাওয়া উচিত। প্রক্রিয়াজাত খাবার দ্রুত ক্ষুধা লাগায় এবং শরীরকে অলস করে তোলে।
৩. প্রকৃতি ও আলোর সংস্পর্শ দিনের কিছুটা সময় প্রকৃতির কাছাকাছি কাটালে মন ও শরীর দুই-ই ভালো থাকে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ঘরের বাইরে বিশুদ্ধ বাতাস ও সূর্যের আলোতে সময় কাটানো উচিত। যাদের অনিদ্রার সমস্যা রয়েছে, তারা এই সময় বাড়িয়ে এক ঘণ্টা করতে পারেন। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্র এবং ঘরের পরিবেশ সতেজ রাখতে ইনডোর প্ল্যান্ট বা ইনডোর গাছ রাখা যেতে পারে। ঘরের পরিবেশ মনোরম করতে প্রাকৃতিক সুগন্ধি ব্যবহার করাও বেশ কার্যকরী।
৪. নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিক কসরত অনেকের ধারণা ব্যায়াম করলে শরীর আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যা সম্পূর্ণ ভুল। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের সময় শরীর সংকেত পায় যে তার এখন শক্তির প্রয়োজন। এর ফলে শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাক হার বৃদ্ধি পায় এবং নতুন শক্তি উৎপন্ন হয়। তাছাড়া ব্যায়ামের ফলে মানবদেহে ‘এন্ডরফিন’ নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মনকে উৎফুল্ল ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে।
৫. কাজের মাঝে বিরতি ও স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ একটানা ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কাজ করা অথবা দীর্ঘক্ষণ কায়িক শ্রম দেওয়া শরীরকে দ্রুত ক্লান্ত করে। তাই কাজের মাঝে ছোট ছোট বিরতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিরতির এই সময়টাতে সহকর্মীদের সাথে কিছুটা সময় গল্প করা, পরিবারের খোঁজ নেওয়া বা প্রিয় মানুষের ছবি দেখে কাটানো যেতে পারে। একই সাথে স্ক্রিন ব্যবহারের সঠিক নিয়ম ও দূরত্ব বজায় রাখা উচিত।
৬. পাওয়ার ন্যাপ ও পর্যাপ্ত ঘুম একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুস্থতার জন্য দৈনিক অন্তত ৭ ঘণ্টা রাতে ঘুমানো বাধ্যতামূলক। রাতের ঘুমের সাথে কোনোভাবেই আপস করা চলবে না। তবে দিনের বেলা অতিরিক্ত ক্লান্তি লাগলে ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের একটি ছোট ঘুম বা ‘পাওয়ার ন্যাপ’ নেওয়া যেতে পারে। এতে দ্রুত মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ফিরে আসে।
৭. শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন সারাদিন নিজেকে কর্মক্ষম রাখতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করা উচিত। এই নিয়ম মেনে চললে অনিদ্রার সমস্যা দূর হয় এবং কাজের সময় শরীর সতেজ থাকে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ মানুষের জন্য পরিমিত চা বা কফি খাওয়া ক্ষতিকর নয়। তবে এর জন্য দিনে মাত্র একটি বা দুটি নির্দিষ্ট সময় বেছে নেওয়া উচিত। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে ক্যাফেইনের ওপর ভরসা না করে এই সুস্থ লাইফস্টাইল বা স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো গড়ে তোলাই দীর্ঘমেয়াদী সুস্বাস্থ্যের আসল চাবিকাঠি।
