দেশে হাম ও এর উপসর্গে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। দিন দিন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৩ মে (শনিবার) পর্যন্ত দেশে হামে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৫১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত এটিই বিশ্বে হামে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ বছর হামে মৃত্যুর দিক থেকে বাংলাদেশ বৈশ্বিক তালিকার শীর্ষে রয়েছে।
বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের অবস্থান
চলতি বছর বিশ্বজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বৈশ্বিক মৃত্যুর তালিকায় বাংলাদেশের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদান। দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৩৭১ জন এই রোগে মারা গেছে। অন্যদিকে, অন্তত ৭১ শিশুর মৃত্যু নিয়ে তালিকার তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, টিকাদানের হার কমে যাওয়ার কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এই সংক্রামক রোগের পুনরুত্থান ঘটেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রাদুর্ভাবটি সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘের এই স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন, মেক্সিকো, অ্যাঙ্গোলা, কাজাখস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান এবং ক্যামেরুনসহ বিশ্বের বহু দেশে নতুন করে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে রুটিন টিকাদানে ঘাটতি এবং টিকার সাময়িক সংকটের কারণেই শিশুরা এই ভাইরাসের ঝুঁকিতে পড়েছে।
সংক্রমণের শুরু ও মাঠপর্যায়ের চিত্র
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দেশের রাজশাহী অঞ্চলে প্রথম হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। শুরুর দিকে রাজশাহী ও এর পার্শ্ববর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে আক্রান্ত শিশুরা উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি হতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত এই হাসপাতালে অজ্ঞাত রোগে ৩৩ শিশুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। যদিও তৎকালীন সময়ে চিকিৎসকরা দাবি করেছিলেন, সব শিশুর মৃত্যুর কারণ হাম ছিল না। তবে রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুর উপজেলার গ্রামগুলোতেই প্রথম এই রোগের প্রকোপ শুরু হয়। জেলাটিতে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর হারও ছিল অনেক বেশি।
বিভাগভিত্তিক মৃত্যুর খতিয়ান
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত দেশের আটটি বিভাগেই হামের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা ঢাকা বিভাগে। বিভাগভিত্তিক মৃত্যুর বিশদ বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
- ঢাকা বিভাগ: সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই বিভাগে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২১৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ৫০ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
- রাজশাহী বিভাগ: মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এই বিভাগে মোট ৮১ জন মারা গেছে। যার মধ্যে ৭৯ জন উপসর্গধারী এবং ২ জন নিশ্চিত হামের রোগী।
- চট্টগ্রাম বিভাগ: এই বিভাগে মোট ৫২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ জন উপসর্গ নিয়ে এবং ১০ জন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ছিল।
- বরিশাল বিভাগ: মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ জন। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩১ জন এবং নিশ্চিত হামে ১৯ জন মারা গেছে।
- সিলেট বিভাগ: এই বিভাগে মোট ৫২ জন মারা গেছে, যার মধ্যে ৪৯ জন উপসর্গ নিয়ে এবং ৩ জন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ছিল।
- ময়মনসিংহ বিভাগ: মোট ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে উপসর্গ নিয়ে ৩৫ জন এবং নিশ্চিত হামে ২ জন মারা গেছে।
- খুলনা ও রংপুর বিভাগ: খুলনা বিভাগে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ২১ জন এবং রংপুর বিভাগে ৫ জন শিশু মারা গেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৫১২ জনের এই মৃত্যুর মিছিলে ৮৬ শিশুর শরীরে ল্যাবরেটরিতে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি ৪২৬ জন মারা গেছে হামের স্পষ্ট উপসর্গ নিয়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতোমধ্যে আক্রান্ত এলাকাগুলোকে ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে। তবে বিপুল সংখ্যক আক্রান্ত শিশুর কারণে দেশের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
