বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে মানসিক সমস্যা। এটি এখন ইবোলা বা করোনার মতো মহামারিকেও ছাড়িয়ে গেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত এক নতুন বৈশ্বিক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পৃথিবীর প্রায় ১২০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এই সংখ্যাটি ১৯৯০ সালের তুলনায় প্রায় ৯৫ শতাংশ বেশি। গবেষকরা জানান, বর্তমানে এই সমস্যাটি ক্যানসার বা হৃদরোগের মতো শারীরিক ব্যাধিকেও পেছনে ফেলে বিশ্বজুড়ে মানুষের পঙ্গুত্ব বা অক্ষমতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২১ মে প্রকাশিত এই গবেষণায় বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন (আইএইচএমই) এবং অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা যৌথভাবে এই সমীক্ষাটি চালান। ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ২০৪টি দেশ ও অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি এ যাবৎকালের সবচেয়ে ব্যাপক ও নির্ভরযোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা।
সবচেয়ে বেশি বেড়েছে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা
গবেষকরা মানুষের সাধারণ ১২টি মানসিক রোগকে এই গবেষণার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। রোগগুলো হলো:
- অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার (উদ্বেগজনিত সমস্যা)
- মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (গুরুতর বিষণ্নতা)
- ডিসথাইমিয়া (দীর্ঘমেয়াদি মৃদু বিষণ্নতা)
- বাইপোলার ডিসঅর্ডার
- সিজোফ্রেনিয়া
- অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার
- কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার (আচরণগত সমস্যা)
- এডিএইচডি (মনোযোগের ঘাটতি)
- অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা (খাবারে অরুচি)
- বুলিমিয়া নার্ভোসা (অতিরিক্ত খাওয়ার রোগ)
- ইডিওপ্যাথিক ডেভেলপমেন্টাল ইন্টেলেকচুয়াল ডিজঅ্যাবিলিটি বা আইডিআইডি (বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা)
- এবং অন্যান্য মানসিক রোগ।
এই দীর্ঘ তালিকার মধ্যে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে উদ্বেগজনিত সমস্যা বা অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার এবং মারাত্মক বিষণ্নতা বা মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার। বিগত তিন দশকে উদ্বেগজনিত রোগ বেড়েছে ১৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে গুরুতর বিষণ্নতার হার বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩১ শতাংশ। বিশেষ করে করোনা মহামারির পরবর্তী সময়ে এই দুটি রোগের প্রকোপ বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি তীব্র হয়েছে।
নারী ও তরুণরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
ল্যানসেটের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মানসিক রোগের ক্ষেত্রে লিঙ্গ ও বয়সভিত্তিক বড় বৈষম্য রয়েছে। বিশ্বে পুরুষদের তুলনায় নারীরা এই সমস্যায় বেশি ভুগছেন। ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৬২ কোটি নারী মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন, যেখানে পুরুষ রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৫ কোটি। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, বাইপোলার ডিসঅর্ডার এবং অ্যানোরেক্সিয়া ও বুলিমিয়ার মতো খাওয়ার সমস্যায় নারীদের আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক বেশি। এর পেছনে পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক বৈষম্য এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের মতো কাঠামোগত কারণ জড়িত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
অন্যদিকে ছেলেদের মধ্যে এডিএইচডি, অটিজম এবং আচরণগত কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডারের মতো সমস্যাগুলো বেশি দেখা যায়। তবে বয়সের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপে রয়েছে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরা। বয়ঃসন্ধিকালের এই সময়ে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক পরিবর্তনের কারণে তারা দ্রুত এই রোগের শিকার হচ্ছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে দেখা গেছে, অনুন্নত দেশের চেয়ে উন্নত ও ধনী দেশগুলোতে মানসিক রোগের হার অনেক বেশি। যেমন নেদারল্যান্ডসে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে ৩,৫৫৫ জন কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। অথচ ভিয়েতনামের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই সংখ্যা মাত্র ১,৩০২ জন। অস্ট্রেলেশিয়া এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতেও এই রোগের বোঝা সবচেয়ে বেশি।
রোগ বৃদ্ধির নেপথ্যে আসল কারণ কী?
মানসিক রোগ এভাবে আকাশচুম্বী হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। গবেষক ও চিকিৎসকরা এর পেছনে মূলত তিনটি বড় প্রভাবক চিহ্নিত করেছেন:
১. সচেতনতার প্রসার: আধুনিক বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আগের চেয়ে মানুষ অনেক বেশি সচেতন। এখন অনেকেই নিজের সমস্যা লুকিয়ে না রেখে খোলাখুলি প্রকাশ করছেন এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। ফলে পরিসংখ্যানে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ২. অতিরিক্ত রোগ নির্ণয় বা ওভার-ডায়াগনোসিস: অনেক ক্ষেত্রে মানুষের জীবনের সাধারণ দুঃখ, মন খারাপ কিংবা সাময়িক আচরণগত পরিবর্তনকেও সরাসরি রোগ হিসেবে তকমা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সুস্থ মানুষও কাগজের কলমে রোগী বনে যাচ্ছেন। 3. ওষুধ কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থ: বিশ্বজুড়ে বিষণ্নতা দূর করার ওষুধ বা অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের বাজার খুব দ্রুত বড় হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকায় এই ওষুধের ব্যবহার এখন লাগামহীন। সমালোচকদের দাবি, ওষুধ কোম্পানিগুলো নিজেদের লাভের উদ্দেশ্যে সাধারণ মানসিক অবস্থাকেও রোগ হিসেবে চিহ্নিত করতে চিকিৎসকদের উৎসাহিত করছে।
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং যুদ্ধবিগ্রহের মতো বৈশ্বিক সংকটগুলোও মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আধুনিক জীবনযাত্রা ও সোশ্যাল মিডিয়ার মরণফাঁদ
অনেক সমাজবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকের মতে, আমাদের আধুনিক জীবনযাপনের ধরনই মানসিক রোগ ডেকে আনছে। শহুরে জীবনের চরম একাকীত্ব, শারীরিক পরিশ্রম না করার অভ্যাস, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও ফাস্টফুড খাওয়া, এবং ঘুমের অনিয়ম মানুষকে ভেতর থেকে অসুস্থ করে তুলছে। মানুষ দিন দিন প্রকৃতি এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
এর মধ্যে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো মাধ্যমে কাটায়, তাদের বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম প্রতিযোগিতা ও লাইক-কমেন্টের মোহ তরুণদের বাস্তব জীবন থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
সমাধান কোন পথে?
ল্যানসেটের গবেষক ড. ড্যামিয়ান সান্টোম্যারো জানান, বিশ্বজুড়ে মানসিক রোগের প্রকোপ বাড়লেও সেই অনুপাতে চিকিৎসা সেবা মিলছে না। বিশ্বে গুরুতর বিষণ্নতায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ মানুষ ন্যূনতম সঠিক চিকিৎসা পান। অনুন্নত দেশগুলোতে এই হার ৫ শতাংশেরও নিচে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব ধরনের মন খারাপকে রোগ বানিয়ে ওষুধ খাওয়া কোনো সমাধান নয়। জীবনের স্বাভাবিক কষ্ট বা দুশ্চিন্তাকে অতিরিক্ত চিকিৎসা বা কাউন্সিলিং দিয়ে সামলানোর চেষ্টা করলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য মানুষের আবার সহজ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া জরুরি। এর জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
- দৈনিক মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কমিয়ে আনতে হবে।
- নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম করতে হবে।
- কৃত্রিম খাবার বর্জন করে পুষ্টিকর ও ভালো খাবার খেতে হবে।
- ভার্চুয়াল যোগাযোগ কমিয়ে পরিবার, আত্মীয় ও বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটাতে হবে।
- চার দেয়ালের বন্দি জীবন থেকে বের হয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
