বর্তমান যুগের তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ যান্ত্রিক জীবনে মানুষ প্রতিনিয়ত সময়ের পেছনে ছুটছে। ঘড়ির কাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে নাগরিক মানুষেরা এক প্রকার ক্লান্ত। দাপ্তরিক কাজ আর পারিবারিক দায়িত্বের তালিকা মেলাতে মেলাতে দিনের শেষে অনেকেই নিজের জন্য একটু সময় বের করতে পারেন না। নিজের প্রতি এই অবহেলা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে তা মানুষের শরীর ও মনের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
অথচ ইসলাম আমাদের এমন এক অনন্য ও বৈপ্লবিক জীবনবিধান উপহার দিয়েছে, যেখানে শুধু আধ্যাত্মিক ইবাদত নয়, বরং মানুষের সার্বিক সুস্থতা নিশ্চিত করার পথ দেখানো হয়েছে। শরীর, মন এবং আত্মার সঠিক যত্ন না নিলে জীবন থমকে যায়। যেমন রোদ ও পানি ছাড়া একটি চারাগাছ কখনোই সতেজ হয়ে বেড়ে উঠতে পারে না, ঠিক তেমনি মানুষের জীবনেরও পরিচর্যা প্রয়োজন।
জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। কোন দিন থেকে বা কীভাবে জীবন নতুন করে সাজানো শুরু করবেন, তা নিয়ে চিন্তিত থাকেন। এই দ্বিধা দূর করতে বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন নিজেকে তিনটি সহজ প্রশ্ন করার পরামর্শ দেন। প্রশ্নগুলো হলো— আজ আমি আমার মনের জন্য কী করেছি? শরীরের জন্য কী করেছি? এবং আমার আত্মার শান্তির জন্য কী করেছি?
গবেষকদের মতে, জীবনকে সুস্থ ও প্রাণবন্ত রাখতে ১২টি ইসলামিক অভ্যাস চমৎকার ভূমিকা পালন করতে পারে। অভ্যাসগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায়: ১. জার্নাল বা ডায়েরি লেখা: সারাদিনের প্রাপ্তি ও প্রতিবন্ধকতার কথা ডায়েরিতে লিখে রাখা উচিত। বিশেষ করে মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিষয়গুলো ডায়েরিতে নিয়মিত লিপিবদ্ধ করলে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। ২. জ্ঞান ও মেধার নিয়মিত চর্চা: ইসলামে জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য একটি বড় দায়িত্ব। নতুন কোনো ভাষা বা শিক্ষণীয় বিষয় শেখার মাধ্যমে নিজের মেধাকে সবসময় শাণিত রাখা যায়। ৩. ভালো বন্ধুদের সঙ্গ: মানুষের মন ভালো রাখতে সৎ ও ভালো বন্ধুদের সাহচর্য জরুরি। এমন বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো উচিত, যারা কল্যাণের পথ দেখায়। মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট রাখা আবশ্যক।
শারীরিক সুস্থতার জন্য: ৪. নিয়মিত হাঁটাহাঁটি: শরীরকে সচল ও কর্মক্ষম রাখতে প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটার অভ্যাস করা উচিত। কারণ একটি সুস্থ দেহ আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য অনেক বড় সহায়ক। ৫. হালকা ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং: প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অথবা রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে শরীর কিছুটা স্ট্রেচিং বা হালকা ব্যায়াম করে নেওয়া ভালো। এটি শরীরের অলসতা ও জড়তা দূর করে সতেজতা ফিরিয়ে আনে। ৬. সময়মতো ঘুমানোর অভ্যাস: শরীর সুস্থ রাখার প্রধান শর্ত পর্যাপ্ত ঘুম। রাতে দ্রুত ঘুমানোর অভ্যাস করলে শেষ রাতে বা ভোরে ফজর সালাত একদম সঠিক সময়ে আদায় করা সহজ হয়। ৭. সচেতন খাদ্যাভ্যাস: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সচেতনতা জরুরি। পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত তাজা ফলমূল এবং শাকসবজি খাওয়া উচিত। এতে শরীর সতেজ ও প্রাণবন্ত থাকে। ৮. পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান: পানিশূন্যতা শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যাপক ক্ষতি করে। তাই সারাদিন নিয়ম মেনে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা প্রয়োজন।
আত্মার প্রশান্তি ও আত্মিক উন্নয়নে: ৯. সময়মতো সালাত আদায়: দৈনিক সালাতের সময় হওয়া মাত্রই দুনিয়াবি সব কাজ সরিয়ে রাখা উচিত। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে সালাত আদায়ে দেরি করা কোনোভাবেই ঠিক নয়। কারণ সালাতের ভেতরেই মানুষের প্রকৃত ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সাফল্য নিহিত রয়েছে। ১০. পবিত্র কোরআনের সাথে সময় কাটানো: প্রতিদিনের ব্যস্ত রুটিন থেকে কিছুটা সময় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও তা অনুধাবনের জন্য বরাদ্দ রাখা দরকার। আল্লাহর পবিত্র কালাম মানুষের হৃদয়ে অনাবিল প্রশান্তি বয়ে আনে। ১১. সর্বদা আল্লাহর জিকির করা: মানুষের মুখের ভাষা ও জিহ্বাকে সর্বদা মহান আল্লাহর জিকিরে সিক্ত রাখা উচিত। এই অভ্যাস পরকালের নেকির পাল্লাকে ভারী করতে সাহায্য করবে। ১২. আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা বা তাওয়াক্কুল: জীবনের যেকোনো কঠিন বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে হতাশ না হয়ে সবার আগে আল্লাহর ওপর দৃঢ় ভরসা রাখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ দোয়া: দৈনন্দিন জীবনে অলসতা, অকর্মণ্যতা ও বার্ধক্যজনিত নানা অক্ষমতা থেকে দূরে থাকতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিয়মিত একটি দোয়া পাঠ করতেন। দোয়াটি হলো— ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল কাসালি ওয়াল হারামি।’ এর বাংলা অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি অলসতা, অতি বার্ধক্য, গোনাহ এবং ঋণের বোঝা থেকে।’ বুখারি শরিফের হাদিস অনুযায়ী, রাসুল (সা.) উম্মতদেরও এই দোয়া বেশি বেশি পাঠ করার তাগিদ দিয়েছেন।
প্রতিটি নতুন দিন মানুষের জীবনে এক একটি নতুন আশীর্বাদ ও সুযোগের নাম। তাই অলসতা ও দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে এই ১২টি অভ্যাস নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা একটি সুন্দর, সুস্থ ও সুশৃঙ্খল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি। নিয়মানুবর্তিতা ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে নাগরিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও চমৎকার ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন উপভোগ করা সম্ভব।
