চারিদিকে উত্তাল নদী আর বঙ্গোপসাগরের গর্জন। এর মাঝেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিন কাটছে প্রায় দুই লাখ মানুষের। কিন্তু তীব্র অসুস্থতায় এই বিশাল জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর মতো নেই কোনো সরকারি হাসপাতাল বা চিকিৎসক। পটুয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীর বাসিন্দাদের জন্য চিকিৎসা যেন এক আকাশছোঁয়া স্বপ্ন। প্রশাসনিকভাবে উপজেলা ঘোষণার দেড় দশক ছুঁইছুঁই হলেও এখানকার মানুষের স্বাস্থ্য ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে সামান্য জ্বর-ঠান্ডা বা ডায়রিয়াতেও তাদের ভরসা করতে হয় ঝাড়ফুঁক কিংবা স্থানীয় ফার্মেসির ওপর।
রাঙ্গাবালী এলাকার দম্পতি বেল্লাল গাজী ও সুমাইয়া আক্তার। তাদের তিন মাসের সন্তান তীব্র ঠান্ডা ও জ্বরে আক্রান্ত। উত্তাল আগুনমুখা নদী পাড়ি দিয়ে তারা গিয়েছিলেন পটুয়াখালীর এক হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সেবা। রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে এবং সন্তান আরও অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কায় পরদিনই তারা বাড়ি ফিরে আসেন। এখন সন্তানকে নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে এই দম্পতির। একই ধরনের দুর্ভোগের শিকার কোড়ালিয়া গ্রামের রাসেল মাহমুদ। তার পাঁচ মাসের শিশুসন্তান ঠান্ডা-জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে তিনি রাঙ্গাবালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান। কিন্তু সেখানে কোনো চিকিৎসক না থাকায় তাকে ফিরতে হয়েছে হতাশ হয়ে। বাধ্য হয়ে তিনি প্রাথমিক কিছু পরামর্শের ওপর ভরসা রাখছেন। রাসেল জানান, পুরো উপজেলায় কোনো সরকারি হাসপাতাল নেই, আর ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও চিকিৎসক পাওয়া যায় না।
ভৌগোলিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা গঠিত হয়। এর চারপাশ বুড়া গৌরাঙ্গ, তেঁতুলিয়া ও আগুনমুখা নদী এবং বঙ্গোপসাগর দিয়ে ঘেরা। মূল উপজেলা সদর থেকেও চারটি ইউনিয়ন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও দুর্গম। উপজেলা ঘোষণার দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০২৩ সালের জুলাই মাসে এখানে ৫০ শয্যার একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ একর জমির ওপর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দরপত্র আহ্বান করে। ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল আবুল কালাম আজাদ – প্রাইম কনস্ট্রাকশন (একেএ-পিসি) নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রথম লটের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু মাত্র এক বছরের মাথায় ২০২৪ সালে অর্থ বরাদ্দ না থাকাসহ বিভিন্ন জটিলতায় কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এই উপজেলার পুরো স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে পাশের গলাচিপা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় থেকে।
উপজেলার চিকিৎসা ব্যবস্থার চিত্র অত্যন্ত করুণ। রাঙ্গাবালীর একমাত্র উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি রয়েছে চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নে। তবে সেটির ভবনটিকে এক বছর আগে ব্যবহারের অনুপযোগী ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে সেখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন প্রতিবেশীদের বাড়ির আঙিনায় বসে কোনোমতে সেবা দিচ্ছেন। এই কেন্দ্রে পাঁচটি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র দুজন— একজন সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা এবং একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা। চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও অফিস সহায়কসহ বাকি পদগুলো শূন্য। অন্যদিকে রাঙ্গাবালী, ছোটবাইশদিয়া, বড়বাইশদিয়া ও চরমোন্তাজ ইউনিয়নে একটি করে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও চারটিতেই মেডিকেল কর্মকর্তার পদ শূন্য। এর মধ্যে চর মোন্তাজ কেন্দ্রের লোকবল সেখানে না যাওয়ায় সেটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এছাড়া মৌডুবি ইউনিয়নে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রই নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর নদীপথে ট্রলার বা লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। মুমূর্ষু রোগীকে কলাপাড়া বা গলাচিপা হাসপাতালে নিতে হলে উত্তাল রাতে জীবন বাজি রেখে স্পিডবোট বা ছোট ইঞ্জিন নৌকার ওপর ভরসা করতে হয়। কোড়ালিয়া গ্রামের বাসিন্দা টুম্পা রানী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জরুরি চিকিৎসার অভাবে পথেই অনেক গর্ভবতী মা ও নবজাতক প্রাণ হারিয়েছেন। এটা এখানকার নিয়মিত ঘটনা।” এছাড়া এসব কেন্দ্রে জরুরি কোনো ওষুধ বা জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পাওয়া যায় না বললেই চলে।
গলাচিপা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক মেজবাহউদ্দিন এবং পটুয়াখালী পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম চিকিৎসকের শূন্যতা ও ওষুধের সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। তারা জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দ্বীপবাসীকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, “কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়া দুই লাখ মানুষের জন্য কোনো হাসপাতাল না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে একটি সুখবর হলো, বন্ধ থাকা মূল হাসপাতালের ভবনের (লট-১) নির্মাণকাজ নতুন ঠিকাদারের মাধ্যমে আগামী এক মাসের মধ্যে শুরু হতে যাচ্ছে। বাকি কাজ দুটি লটে ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।” রাঙ্গাবালীবাসীর আশা, এবার অন্তত নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হবে এবং তাদের দীর্ঘদিনের চিকিৎসা কষ্টের অবসান ঘটবে।
