আমাদের অজান্তেই প্রতিদিন খাবার ও পানির মাধ্যমে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা শরীরের ভেতরে প্রবেশ করছে। গভীর উদ্বেগজনক এই বৈশ্বিক সংকট থেকে মানবদেহকে রক্ষা করতে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা একটি অত্যন্ত সহজ এবং কার্যকরী ঘরোয়া উপায় খুঁজে পেয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ খাবার পানি ফুটিয়ে এবং তা ছেঁকে নিয়ে পান করলে পানি থেকে ক্ষতিকারক প্লাস্টিক কণা প্রায় সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব।
চীনের কুয়াংচৌ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি ও জিনান ইউনিভার্সিটির বায়োমেডিকেল প্রকৌশলী জিমিন ইউ এবং তার গবেষক দল ২০২৪ সালে এই সংক্রান্ত একটি গবেষণা সম্পন্ন করেন। তাদের এই গবেষণা প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি লেটার্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষক দলের মতে, পানি পরিশোধনের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাগুলো পুরোপুরি প্লাস্টিক কণা মুক্ত করতে পারে না। ফলে সরবরাহ করা ট্যাপের পানির মাধ্যমে এই ন্যানো ও মাইক্রোপ্লাস্টিক (এনএমপি) মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ।
গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা মৃদু পানি এবং খনিজ সমৃদ্ধ ক্ষারীয় বা কঠিন পানি—উভয় ধরনের ট্যাপের পানিতে কৃত্রিমভাবে প্রচুর পরিমাণে ন্যানোপ্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক যুক্ত করে পরীক্ষা চালান। এরপর সেই পানি ভালোভাবে ফুটিয়ে ঠান্ডা করা হয় এবং তলানি ছেঁকে আলাদা করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, পানি ফোটানো এবং ছাঁকার এই প্রক্রিয়াটি প্লাস্টিক দূষণ কমাতে নাটকীয়ভাবে কাজ করে। পানির ধরন ভেদে সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা এই পদ্ধতিতে পানি থেকে অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, খনিজ সমৃদ্ধ কঠিন পানি ফুটালে প্রাকৃতিকভাবেই তাতে ক্যালসিয়াম কার্বনেট বা চুনাপাথরের আস্তরণ তৈরি হয়, যা সাধারণত আমরা কেটলির ভেতরের দেওয়ালে সাদাটে খড়িমাটির মতো জমতে দেখি। পানি যখন উত্তপ্ত হয়, তখন তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণে দ্রবণ থেকে ক্যালসিয়াম কার্বনেট আলাদা হয়ে সলিড বা শক্ত দানা গঠন করে। এই দানাগুলো পানির প্লাস্টিক কণাগুলোকে নিজেদের ভেতরে আটকে ফেলে একটি আস্তরণ তৈরি করে। বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, প্রতি লিটার পানিতে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের পরিমাণ ৮০ মিলিগ্রাম থাকলে প্লাস্টিক দূর হওয়ার হার থাকে ৩৪ শতাংশ। কিন্তু এই খনিজের পরিমাণ বেড়ে ১৮০ থেকে ৩০০ মিলিগ্রাম হলে প্লাস্টিক কণা অপসারণের কার্যকারিতা যথাক্রমে ৮৪ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অন্যদিকে, খনিজ কম থাকা মৃদু পানিতেও ফোটানোর মাধ্যমে প্রায় ২৫ শতাংশ বা এক-চতুর্থাংশ প্লাস্টিক কণা দূর করা সম্ভব হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, প্লাস্টিক মোড়ানো এই চুনাপাথরের কণাগুলো চা ছাঁকার সাধারণ স্টিলের ছাঁকনি বা কফি ফিল্টারের মাধ্যমে খুব সহজেই পানি থেকে আলাদা করা যায়। এর আগে বিভিন্ন গবেষণায় ট্যাপের পানিতে পলিপ্রোপিলিন, পলিস্টাইরিন, পলিথিন এবং পলিথিন টেরেফথালেটের মতো ক্ষতিকর প্লাস্টিক উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা মানুষ নিয়মিত গ্রহণ করছে। ২০২৫ সালের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় আর্লিংটনের একটি সাহিত্য পর্যালোচনা থেকেও জানা যায় যে, বর্জ্য পানি শোধন প্ল্যান্টগুলো শতভাগ মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করতে পারছে না বলেই খাবার পানি এই দূষণের বড় উৎস হয়ে উঠেছে। বিশ্বে এ পর্যন্ত উৎপাদিত প্রায় ৯ বিলিয়ন মেট্রিক টন প্লাস্টিকের সিংহভাগই পুরোপুরি ধ্বংস না হয়ে ক্ষয়ে ক্ষয়ে সূক্ষ্ম ধুলায় পরিণত হয়েছে এবং পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে।
যদিও মানবদেহে এই প্লাস্টিক কণা ঠিক কতটা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে তা নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট গবেষণা চলছে, তবে এটি শরীরের জন্য যে অত্যন্ত ক্ষতিকর তা নিশ্চিত। ইতোমধ্যে প্লাস্টিকের এই কণাগুলো মানুষের অন্ত্রের অণুজীবের (গাট মাইক্রোবায়োম) পরিবর্তন এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরিসহ নানা শারীরিক জটিলতার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই কৃত্রিম উপাদান যাতে শরীরে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য গবেষক দল পানি ফোটানোকে একটি চমৎকার দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী কৌশল হিসেবে দেখছেন। বিশ্বের কিছু অঞ্চলে পানি ফুটিয়ে পানের প্রাচীন ঐতিহ্য থাকলেও বিশ্বব্যাপী এর প্রচলন নেই। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, প্লাস্টিক দূষণের এই ভয়াবহ সময়ে সুস্থ থাকার জন্য ঘরে ঘরে পানি ফুটিয়ে ছাঁকার এই সহজ অভ্যাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে।
