সুস্থ জীবনযাপনের জন্য আমরা অনেকেই পুষ্টিকর খাবার খাই এবং বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলি। তবে জীবনযাত্রার কিছু ভুল অভ্যাসের কারণে যেকোনো সময় মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে ভুগছেন। অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই এই রোগ শরীরের ভেতর বাসা বাঁধে। চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরীক্ষার পর হঠাৎ জানা যায় যে কিডনি এরই মধ্যে বিকল হতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের প্রতিদিনের কিছু সাধারণ ও অসচেতন অভ্যাসই এই নীরব ক্ষতি করে চলেছে। কিডনি সুরক্ষায় দৈনিক জীবনযাত্রার ক্ষতিকর ৬টি অভ্যাস দ্রুত বদলে ফেলা জরুরি।
১. পর্যাপ্ত পানি পান না করার প্রবণতা
ব্যস্ততার কারণে অনেকেই সারাদিন নিয়মিত পানি পান করতে ভুলে যান। শরীরে পর্যাপ্ত পানির অভাব হলে কিডনি রক্ত থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বা বিষাক্ত বর্জ্য উপাদান অপসারণ করতে পারে না। ফলে শরীরের ভেতরেই মারাত্মক ইনফেকশন বা সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে কিডনিতে পাথর জমার আশঙ্কা দেখা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, কিডনির পাথর বড় হয়ে গেলে অস্ত্রোপচার বা অপারেশন ছাড়া তা দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে।
২. কাঁচা লবণ ও বাড়তি সোডিয়াম গ্রহণ
অনেকেরই মূল খাবারের সাথে পাতে অতিরিক্ত কাঁচা লবণ খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে। এই বাড়তি লবণ গ্রহণ কিডনির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া বাজার থেকে কেনা প্যাকেটজাত চিপস, বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস এবং ইনস্ট্যান্ট নুডলসে উচ্চ মাত্রায় সোডিয়াম ব্যবহার করা হয়। অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে প্রবেশ করলে রক্তচাপ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির সূক্ষ্ম ধমনীগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এর কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
৩. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ সেবন
সামান্য মাথাব্যথা, গা-ব্যথা কিংবা হালকা জ্বর হলেই ফার্মেসি থেকে ব্যথানাশক বা পেইনকিলার কিনে খাওয়ার প্রবণতা আমাদের দেশে ব্যাপক। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘন ঘন এই জাতীয় ওষুধ খাওয়া কিডনির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। সাময়িকভাবে ব্যথা কমলেও এসব ওষুধ কিডনির স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। দীর্ঘ মেয়াদে এই অভ্যাসের কারণে কিডনি সম্পূর্ণ বিকল বা ফেইলিওর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৪. অতিরিক্ত চিনি ও কোমল পানীয় পানের আসক্তি
তীব্র গরমে বা ক্লান্তি দূর করতে অনেকেই সোডা ওয়াটার কিংবা বোতলজাত কোমল পানীয় পান করেন। আবার অনেকে বাড়িতে নিয়মিত অতিরিক্ত চিনি দিয়ে চা, কফি বা শরবত খাওয়ার অভ্যাস বজায় রাখেন। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে মানবদেহে স্থূলতা (ওবেসিটি) এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস হলো কিডনি নষ্ট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
৫. প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারের ওপর নির্ভরতা
ফাস্টফুড বা দোকানের ভাজাপোড়া না খেলেও অনেকেই নিয়মিত প্যাকেটজাত বিস্কুট, চিপস ও চকলেট খেয়ে থাকেন। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলছেন, প্রক্রিয়াজাত খাবারে থাকা কৃত্রিম উপাদান শরীরের রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। যারা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসে ভোগেন, তাদের কিডনি দ্রুত কার্যক্ষমতা হারায়। তাই দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা থেকে এসব প্যাকেটজাত খাবার বাদ দেওয়া উচিত।
৬. রাত জাগা এবং অপর্যাপ্ত ঘুম
আধুনিক জীবনে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কেউ অফিসের কাজের প্রয়োজনে আবার কেউ মোবাইল স্ক্রিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে রাতের পর রাত পার করে দিচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, ঘুম কম হলে বা রাত জাগলে শরীরের স্বাভাবিক মেটাবলিজম ব্যাহত হয়। মানবদেহের কিডনির কার্যক্ষমতা মূলত ২৪ ঘণ্টার একটি ঘুম-জাগরণ চক্রের (স্লিপ-ওয়েক সাইকেল) মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কিডনির কোষগুলো পুনর্গঠনের সুযোগ পায় না, যা ধীরে ধীরে অঙ্গটিকে অকেজো করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও বাঁচতে করণীয়
কিডনি ফাউন্ডেশনের বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে কিডনি রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই শুরুতেই সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কিডনি ভালো রাখতে প্রতিদিন নিয়ম মেনে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। একই সাথে প্যাকেটজাত ও অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার পুরোপুরি বর্জন করা জরুরি। সুস্থ থাকতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো এবং ভোরে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো মেনে চলা কঠিন মনে হতে পারে। তবে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে কিডনি সুরক্ষিত থাকবে এবং সামগ্রিকভাবে দীর্ঘায়ু লাভ করা সম্ভব হবে।
