উৎসব মানেই আনন্দ, মিলনমেলা আর প্রিয়জনদের সঙ্গে বিশেষ সময় কাটানো। নানা আয়োজন, সুস্বাদু খাবার আর ভ্রমণের কারণে এই সময়টা হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উৎসবের দিনগুলো একটু বাড়তি সতর্কতারও দাবি রাখে। আগে থেকেই কিছু বিষয় পরিকল্পনায় রাখলে তারাও নিশ্চিন্তে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। চিকিৎসকদের মতে, সামান্য অসচেতনতা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই আনন্দের মাঝেও নিয়মের বিষয়ে অনড় থাকা জরুরি।
চিকিৎসকের পরামর্শ ও সুগার পরীক্ষা
উৎসবের সময় খাবারের ধরন ও দৈনন্দিন রুটিন বদলে যায়। এর ফলে ইনসুলিন বা ওষুধের মাত্রায় পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। তাই উৎসব শুরুর আগেই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি। এ সময় রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মূল খাবারের আগে, খাবারের প্রায় দুই ঘণ্টা পরে এবং রাতে ঘুমানোর আগে সুগার মেপে রাখা ভালো। এতে হঠাৎ শর্করা বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়ার ঝুঁকি দ্রুত বোঝা যায় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়।
খাদ্যাভ্যাসে বিশেষ পরিকল্পনা
উৎসবের খাবার মানেই অতিরিক্ত খাওয়া নয়। পরিমাণ বুঝে খাওয়া এবং ক্যালরি নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। উৎসবে মিষ্টিজাতীয় খাবারের আধিক্য থাকে, তাই কম চিনি বা চিনি ছাড়া খাবার বেছে নেওয়া ভালো। ভাজাপোড়ার বদলে সেদ্ধ, বেকড বা গ্রিল করা খাবার খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। পাশাপাশি শাকসবজি ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার বেশি খেলে শরীরে গ্লুকোজের শোষণ ধীর হয়, যা বেশ উপকারী। ফলের ক্ষেত্রে কম চিনিযুক্ত ফল বেছে নেওয়া উচিত। উৎসবের ব্যস্ততায় শরীরে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা এড়াতে পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি।
শারীরিক সক্রিয়তা ও ব্যায়াম
উৎসবের ব্যস্ততার মাঝেও শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা প্রয়োজন। প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং করলে রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুবিধা হয়। বিশেষ করে ভারী খাবারের পর কিছুক্ষণ হাঁটা রক্তে শর্করার আকস্মিক বৃদ্ধি রোধ করতে বেশ উপকারী ভূমিকা রাখে।
ঘুম ও বিশ্রামের গুরুত্ব
উৎসবের দিনগুলোতে অনেকেরই ঘুমের রুটিন এলোমেলো হয়ে যায়। কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের বিপাকক্রিয়া ব্যাহত হয়, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তুলতে পারে। তাই অতিরিক্ত রাত জাগা এড়িয়ে নিয়মিত ঘুম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের দিকে খেয়াল রাখা দরকার। প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পারিবারিক সহযোগিতা
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিজের আত্মসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘একদিন বেশি খেলেই কিছু হবে না’—এমন ক্ষতিকর ভাবনা থেকে দূরে থাকতে হবে। নিজের স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। শুধু রোগীর একা চেষ্টা নয়, পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদেরও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। উৎসবের আয়োজনে তাদের উচিত ডায়াবেটিস রোগীর জন্য উপযোগী ও স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা রাখা।
ওষুধ ও জরুরি প্রস্তুতি
উৎসবের দিনগুলোতে কিংবা ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে সংগ্রহে রাখতে হবে। যারা ইনসুলিন ব্যবহার করেন, তাদের অবশ্যই সঠিক তাপমাত্রায় ইনসুলিন সংরক্ষণ করতে হবে। উৎসবের কোলাহলে ওষুধ খাওয়ার কথা ভুলে যাওয়া এড়াতে মোবাইল ফোন বা ঘড়িতে রিমাইন্ডার সেট করা যেতে পারে।
ডায়াবেটিস রোগীদের হঠাৎ রক্তে শর্করা কমে যাওয়া (হাইপোগ্লাইসেমিয়া) বা বেড়ে যাওয়ার (হাইপারগ্লাইসেমিয়া) ঝুঁকি থাকে। হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে শরীর কাঁপানো বা অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। তাই জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা আগে থেকেই জেনে রাখা ভালো। উৎসবের দিনগুলোতে বাইরে বের হলে সাথে গ্লুকোজ ট্যাবলেট, চিনি, দ্রুত শক্তি দেয় এমন খাবার, গ্লুকোমিটার এবং চিকিৎসকের যোগাযোগ নম্বর রাখা বাধ্যতামূলক। একটু সচেতনতাই পারে উৎসবের প্রতিটি মুহূর্তকে নিরাপদ ও আনন্দময় করে তুলতে।
