ঈদ মানেই উৎসবের আমেজ আর খাওয়া-দাওয়ার মহা আয়োজন। এই আনন্দের সময়ে সবার ঘরেই গরু বা খাসির মাংসের হরেক রকম পদের বাহারি রান্না করা হয়। সুস্বাদু এসব খাবারের স্বাদ নিতে সুস্থ দাঁত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাংস চিবানো কিংবা শক্ত হাড় ভাঙার মতো পুরো কাজটিই করতে হয় দাঁত দিয়ে। কিন্তু উৎসবের এই সময়ে খাওয়ার সময় দাঁতের কোনায় মাংসের টুকরো আটকে যেতে পারে। আর তা থেকে হুট করেই ঈদের আনন্দের মাঝে তীব্র ব্যথা ডেকে আনতে পারে। তাই ঈদের আগে এবং পরে দাঁতের সুরক্ষায় বিশেষ যত্ন নেওয়া এবং সচেতন হওয়া ভীষণ জরুরি।
ঈদে দাঁতব্যথার ঝুঁকি বাড়ার কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎসবের দিনগুলোতে অসচেতনতার কারণে দাঁত ও মাড়ির নানাবিধ সমস্যা দেখা দিতে পারে। সাধারণত যেসব কারণে এই ঝুঁকি বাড়ে, সেগুলো হলো:
- খাদ্যকণা জমে থাকা: খাওয়ার পর দাঁতের ফাঁকে মাংসের কণা কিংবা আঠালো প্লাক জমে থাকা।
- হাড় চিবানোর আঘাত: অসাবধানতাবশত মাংসের শক্ত হাড় চিবানোর কারণে দাঁতের গোড়া ফেটে যাওয়া কিংবা রুট ক্যানেল করা দাঁতে ক্যাপ না থাকায় তা ভেঙে যাওয়া।
- ফিলিং নষ্ট হওয়া: দাঁতের পুরোনো বা আগের কোনো ফিলিং হঠাৎ কোনো কারণে ফেটে যাওয়া।
- সংক্রমণ ও প্রদাহ: দাঁতের গোড়ায় বা মাড়িতে আগে থেকেই ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ বা ফোলা ভাব থাকা।
- মিষ্টি জাতীয় খাবার: অতিরিক্ত মিষ্টি বা শর্করাজাতীয় খাবার খাওয়ার পর মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার না করা। এর ফলে মুখে দ্রুত ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধে এবং মাড়িতে প্রদাহ তৈরি হয়।
- আক্কেলদাঁতের সমস্যা: মাড়িতে নতুন আক্কেলদাঁত গজানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকা।
- অন্যান্য বাহ্যিক কারণ: দাঁতে সরাসরি কোনো আঘাত লাগা, ঘুমের ঘোরে দাঁত কিড়মিড় করা কিংবা সাইনাসের সংক্রমণ থাকা।
দাঁতব্যথা হলে তাৎক্ষণিক করণীয়
ঈদের ছুটির দিনগুলোতে সাধারণত ডেন্টাল ক্লিনিকগুলো বন্ধ থাকে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ডেন্টিস্ট বা চিকিৎসকের কাছে যাওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগপর্যন্ত সাময়িক স্বস্তির জন্য ঘরে বসেই কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
কুসুম গরম পানিতে কুলকুচি: দাঁতে অস্বস্তি বা ব্যথা শুরু হলে প্রথমে মুখ ভালো করে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে বা কুলকুচি করে নিতে হবে। প্রয়োজনে সামান্য লবণ মিশিয়ে নেওয়া যেতে পারে, যা ব্যাকটেরিয়া দূর করতে সাহায্য করে।
ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার: দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা মাংসের টুকরো বের করতে অনেকেই কাঠ বা প্লাস্টিকের টুথপিক ব্যবহার করেন। এটি মাড়ির মারাত্মক ক্ষতি করে। টুথপিকের পরিবর্তে অবশ্যই ডেন্টাল ফ্লস বা বিশেষ সুতা ব্যবহার করে আলতোভাবে খাবার বের করতে হবে।
ব্যথানাশক ওষুধ: ব্যথা যদি সহ্যের বাইরে চলে যায়, তবে তা সাময়িকভাবে কমাতে ফার্মেসি থেকে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া পাওয়া যায় এমন সাধারণ ও ওভার-দ্য-কাউন্টার (OTC) ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যেতে পারে।
ঠান্ডা সেঁক: মাংসের হাড় চিবিয়ে দাঁতে কোনো আঘাত বা ট্রমা পেলে গালের বাইরে থেকে বরফ বা ঠান্ডা কাপড়ের সেঁক দিতে হবে। এটি রক্ত চলাচল সাময়িক কমিয়ে ব্যথা ও ফোলা ভাব দ্রুত উপশম করে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?
ঈদের সুস্বাদু খাবারের পূর্ণ স্বাদ নিতে এবং উৎসবের দিনগুলো ব্যথামুক্ত রাখতে দাঁতের সঠিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাই আপনাকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা থেকে দূরে রাখতে পারে। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে কোনোভাবেই দেরি করা যাবে না। নিম্নোক্ত পরিস্থিতিগুলোতে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে:
- যদি দাঁতের ব্যথা ১ বা ২ দিনের বেশি সময় ধরে একটানা চলতে থাকে।
- তীব্র ব্যথার পাশাপাশি যদি শরীরে জ্বর আসে।
- মাড়ি অতিরিক্ত ফুলে যাওয়া, খাবার কামড় দিতে গেলে তীব্র ব্যথা হওয়া, মাড়ি লাল হওয়া কিংবা মুখ থেকে দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বের হওয়ার মতো সংক্রমণের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দিলে।
- দাঁতের ব্যথার তীব্রতা এত বেশি হয় যা ক্রমান্বয়ে শ্বাস নিতে কষ্ট তৈরি করে কিংবা খাবার গিলতে সমস্যা সৃষ্টি করে।
ঈদের আনন্দকে বিষাদে রূপ নিতে না দিতে নিয়মিত দুই বেলা ব্রাশ করার পাশাপাশি মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
