বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারির ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। এর মাঝেই নতুন এক মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। এই ব্যাধিটির নাম ইবোলা। এটি কোনো সাধারণ জ্বর বা ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়। এটি চরম সংক্রামক এবং প্রাণঘাতী হেমোরেজিক ফিভার বা রক্তক্ষরণকারী জ্বর। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে অণুজীববিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই ভাইরাস বর্তমান জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিরাট হুমকি। সময় থাকতে সচেতন না হলে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কঠোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে না তুললে এটি যেকোনো মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা
ইবোলা ভাইরাসের ইতিহাস প্রথম জানা যায় ১৯৭৬ সালে। এরপর ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকার তিনটি দেশে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করে। দেশগুলো হলো গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনে। এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ইবোলার প্রাদুর্ভাব। সেই সময়ে এই ভাইরাসের আক্রমণে ১১ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকার কিছু জায়গায় ইবোলার নতুন স্ট্রেইন বা সাব-টাইপের পুনরাবির্ভাব ঘটেছে। বর্তমান যুগে বৈশ্বিক যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত ও দ্রুতগতির। ফলে আফ্রিকার একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ভাইরাস মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে। এই তীব্র ঝুঁকির কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবার আন্তর্জাতিক সীমান্ত এবং বিমানবন্দরগুলোতে কড়া নজরদারি করার নির্দেশ দিয়েছে।
অণুজীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভাইরাসটির রূপ
মাইক্রোবায়োলজির দৃষ্টিকোণ থেকে ইবোলা হলো একটি আরএনএ (RNA) ভাইরাস। এটি ফিলোভিরিডি পরিবারের অন্তর্গত। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে এর গঠনটি সুতার মতো বা ফিলামেন্টাস দেখায়। এই ভাইরাস এত ভয়ংকর হওয়ার মূল কারণ হলো এর অতি উচ্চ মৃত্যুহার। ইবোলায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে স্ট্রেইনভেদে ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত মানুষ মারা যান।
ইবোলা ভাইরাস মানবশরীরে প্রবেশের পর আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। এটি সরাসরি রক্তনালির ভেতরের দেয়ালকে আক্রমণ করে এবং তা নষ্ট করে ফেলে। এর ফলে রক্তনালিগুলো তাদের তরল ধরে রাখার ক্ষমতা হারায়। একপর্যায়ে শরীরের ভেতরে এবং বাইরে অনিয়ন্ত্রিত রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
সংক্রমণের সুনির্দিষ্ট মাধ্যমসমূহ
ইবোলা ভাইরাস মূলত সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। বন্য পশুপাখির শরীরে এই ভাইরাস প্রাকৃতিকভাবে অবস্থান করে। বিশেষ করে ফ্রুট ব্যাট বা একধরনের চামচিকার শরীরে এটি থাকে। এদের কামড়ানো ফল খেলে মানুষ সংক্রমিত হতে পারে। আবার এদের শরীর থেকে ভাইরাসটি প্রথমে বানর বা শিম্পাঞ্জির দেহে ছড়ায়। এরপর তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
- মানবদেহ থেকে মানবদেহে সংক্রমণ: আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, লালা, বমি, মলমূত্র, ঘাম বা বীর্যের সরাসরি সংস্পর্শে এলে সুস্থ মানুষ সংক্রমিত হয়।
- মৃতদেহ থেকে সংক্রমণ: ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির শরীরে ভাইরাসের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই মৃতদেহ দাফন ও সৎকার করার সময় অসাবধানতাবশত সামান্য ছোঁয়া লাগলেও এই ভাইরাস জ্যামিতিক হারে ছড়িয়ে পড়ে।
রোগের লক্ষণ ও মারাত্মক জটিলতা
ইবোলা ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড বা সুপ্তিকাল হলো ২ থেকে ২১ দিন। অর্থাৎ শরীরে ভাইরাস প্রবেশের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে এই সময়টুকু লাগে। চিকিৎসকরা ইবোলার লক্ষণগুলোকে প্রধানত দুটি ধাপে ভাগ করেছেন।
- প্রাথমিক লক্ষণ: হঠাৎ করে তীব্র জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, তীব্র দুর্বলতা এবং গলাব্যথা দেখা দেয়। এই লক্ষণগুলো সাধারণত সাধারণ ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া কিংবা টাইফয়েডের মতো মনে হতে পারে। যার কারণে শুরুতে রোগ নির্ণয় ব্যাহত হয়।
- পরবর্তী ও মারাত্মক লক্ষণ: রোগের তীব্রতা বাড়লে বমি, ডায়রিয়া এবং চামড়ায় ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক ধাপে শরীরের ভেতরের অঙ্গ যেমন লিভার ও কিডনি অকেজো হতে শুরু করে। একই সঙ্গে চোখ, কান, নাক, মাড়ি এবং মলদ্বার দিয়ে অনবরত রক্তক্ষরণ হতে থাকে।
এই রোগে জটিলতা অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী। যারা অলৌকিকভাবে এই প্রাণঘাতী রোগ থেকে বেঁচে যান, তাদেরও দীর্ঘদিন ক্রনিক জয়েন্ট পেইন বা দীর্ঘস্থায়ী জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা সহ্য করতে হয়। চোখের নানা সমস্যা এমনকি চিরতরে অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং চরম মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে তাদের জীবন অতিবাহিত করতে হয়।
কঠিন রোগনির্ণয় ও ল্যাবরেটরি সতর্কতা
লক্ষণ দেখে প্রাথমিক অবস্থায় ইবোলা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। ল্যাবরেটরিতে মলিকুলার পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগ নিশ্চিত করা হয়। এর জন্য প্রধানত দুটি পরীক্ষা ব্যবহৃত হয়:
১. আরটি-পিসিআর (RT-PCR): এটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা। এর মাধ্যমে আক্রান্তের রক্তে ইবোলা ভাইরাসের আরএনএ (RNA) শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
২. ইএলআইএসএ (ELISA) টেস্ট: ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি কিংবা অ্যান্টিজেন খোঁজার জন্য এই পরীক্ষাটি করা হয়।
ইবোলা ভাইরাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই কারণে এর নমুনা সাধারণ কোনো ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা যায় না। এর পরীক্ষার জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত বায়োসেফটি লেভেল ৪ বা বিএসএল-৪ (BSL-4) ল্যাবরেটরির প্রয়োজন হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও বিশেষায়িত।
চিকিৎসা পদ্ধতি ও টিকার বর্তমান অবস্থা
দুর্ভাগ্যবশত, ইবোলার শতভাগ কার্যকর কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এখনো আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকরা মূলত রোগীকে সাপোর্টিং কেয়ার বা লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে রোগীকে দ্রুত আইসোলেশনে নেওয়া, শিরায় তরল বা স্যালাইন দেওয়া, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা, কৃত্রিম উপায়ে অক্সিজেন সরবরাহ এবং রক্তক্ষরণ বন্ধের চেষ্টা করা।
তবে বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানে আশার আলোও রয়েছে। ইবোলার ‘জাইর স্ট্রেইন’-এর জন্য কার্যকর এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘এরভেবো’ (Ervebo) নামক একটি অত্যন্ত কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে। রিং-ভ্যাকসিনেশন পদ্ধতির মাধ্যমে সংক্রমণ এলাকায় দ্রুত এই টিকা প্রয়োগ করে মহামারি সফলভাবে ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশের করণীয়: জাতীয় রোডম্যাপের দাবি
বাংলাদেশ বা যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য ইবোলা মহামারি সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব। আমাদের চিকিৎসা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিরোধই একমাত্র কার্যকর উপায়। এই মহাবিপদ থেকে দেশকে রক্ষা করতে অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি জাতীয় রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। এই লক্ষ্যে চার স্তরের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. পোর্ট অফ এন্ট্রিতে কঠোর নজরদারি: দেশের আন্তর্জাতিক সব বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরে থার্মাল স্ক্যানারগুলো সার্বক্ষণিক সচল রাখতে হবে। আফ্রিকা বা আক্রান্ত দেশ থেকে আসা যাত্রীদের সুনির্দিষ্ট স্ক্রিনিং করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের জন্য ২১ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করতে হবে।
২. আইসোলেশন সেন্টার ও বিশেষায়িত ল্যাব: সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালগুলোতে এখনই ইবোলা কর্নার এবং বিশেষায়িত আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখতে হবে। একই সঙ্গে আইসিডিডিআরবি (icddr,b) বা আইইডিসিআর (IEDCR)-এর ল্যাবগুলোকে বিএসএল-৪ মানে উন্নীত করতে হবে অথবা জরুরি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে।
৩. চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও পিপিই সরবরাহ: সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার জন্য সর্বোচ্চ মানের পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (PPE) পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত রাখতে হবে। ইবোলা রোগীর ব্যবস্থাপনার জন্য চিকিৎসক এবং নার্সদের বিশেষ গাইডলাইন ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
৪. গণসচেতনতা তৈরি এবং গুজব প্রতিরোধ: গণমাধ্যমের সাহায্যে সাধারণ মানুষকে এই ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। বন্য জন্তু বা চামচিকার আধা খাওয়া ফল না খাওয়া এবং জঙ্গল থেকে শিকার করা পশুর মাংস খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানাতে হবে। একই সঙ্গে রোগ নিয়ে যেকোনো গুজব কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।
