দেশে ক্যানসার চিকিৎসার খরচের বড় অংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে। মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ টাকাই বহন করতে হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গত ৭ মে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। বিপুল এই খরচের ধাক্কায় দেশের বহু পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। অসংখ্য পরিবার নতুন করে দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে জমি ও সহায়-সম্বল হারিয়ে বহু মানুষ ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন।
বিআইডিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের একটি পরিবারকে চিকিৎসাবাবদ প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা খরচ করতে হয়। এটি একটি পরিবারের মোট খরচের প্রায় ১১ শতাংশ। এই ব্যয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ছে দরিদ্র পরিবারগুলো। তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত চলে যাচ্ছে শুধু চিকিৎসার পেছনে। অথচ ধনী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই খরচের হার মাত্র ৫ শতাংশ। এলাকাভেদে এই ব্যয়ের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। শহরাঞ্চলের পরিবারগুলো চিকিৎসায় গড়ে মাসে ৪ হাজার ১৯২ টাকা ব্যয় করে। অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকার পরিবারগুলোর পেছনে এই মাসিক খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ১০৯ টাকা।
গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যানসার আক্রান্ত কোনো রোগীকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করাতে গড়ে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়। হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের খরচের সবচেয়ে বড় খাতগুলো হলো ওষুধ কেনা, রোগ নির্ণয় পরীক্ষা, অস্ত্রোপচার এবং শয্যা ভাড়া। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভর্তি রোগীদের মোট খরচের ২৬ শতাংশ চলে যায় ওষুধ কিনতে। এছাড়া ১৭ শতাংশ টাকা রোগ নির্ণয় পরীক্ষায় এবং ২৩ শতাংশ টাকা অস্ত্রোপচারের পেছনে ব্যয় হয়।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার এই ব্যয়বহুল পরিস্থিতির পাশাপাশি রয়েছে সেবার দীর্ঘসূত্রতা। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রেডিওথেরাপি নেওয়ার জন্য রোগীদের দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। ফরিদপুর থেকে আসা ৫২ বছর বয়সী সালমা বেগম মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত। তিনি জানান, এই হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতে চার মাস সময় লেগে যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ বছর ধরে পান, জর্দা, গুল ও সাদাপাতা ব্যবহারের কারণে তিনি এই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর মতো কোনো আর্থিক সামর্থ্য তার নেই। ফলে হাসপাতালের সিরিয়াল আসার আগে তিনি বেঁচে থাকবেন কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন এই রোগী।
দেশে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে রয়েছে তামাকের ব্যবহার, খাবারে ভেজাল, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা, পরিবেশ দূষণ ও বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ। চিকিৎসকেরা অবশ্য বলছেন, আগে অনেক ক্যানসার রোগ নির্ণয়ের অভাবে আড়ালে থেকে যেত। বর্তমানে রোগ শনাক্তকরণের সুযোগ ও সুবিধা বাড়ায় আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা বেশি সামনে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং গ্লোবাল ক্যানসার অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। আর এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর মারা যাচ্ছেন ১ লাখের বেশি মানুষ। পুরুষ ও নারীদের ক্ষেত্রে ক্যানসারের ধরনে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস, মুখগহ্বর ও লিভার ক্যানসারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে নারীরা মূলত স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যানসারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।
ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ তামাকের ব্যবহার দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বড় আঘাত হানছে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী জানান, তামাক ব্যবহারজনিত বিভিন্ন রোগে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। তামাকের ক্ষতিকর ব্যবহারের ফলে দেশে বার্ষিক স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে তিনি দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করার তাগিদ দিয়েছেন। একই সাথে তামাকপণ্যের ওপর কার্যকর কর আরোপের প্রস্তাব করেছেন তিনি।
গত বছর আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল ফর ইকুয়িলিটি ইন হেলথ’-এ বাংলাদেশের ক্যানসার পরিস্থিতি নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। সেই গবেষণার তথ্যে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ক্যানসার রোগীদের গড় বার্ষিক চিকিৎসা ব্যয় একটি পরিবারের মোট বার্ষিক আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার ক্যানসারের চিকিৎসা চালাতে গিয়ে বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। অনেক পরিবার জমি বিক্রি করে কিংবা আগের জমানো সঞ্চয় ভেঙে চিকিৎসার টাকা জোগাড় করে। এভাবে ক্যানসারের ব্যয় মেটাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজেদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন।
