বাংলাদেশে তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ফাস্টফুড নির্ভর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও জীবনাচরণের নেতিবাচক পরিবর্তন এই পরিস্থিতির জন্য মূলত দায়ী। বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় উচ্চ রক্তচাপ কেবল প্রবীণদের রোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে তা তরুণদের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। এটি এখন দেশের তরুণ কর্মজীবী ও কিশোরদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫’ অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় এক নম্বরে স্থান করে নিয়েছে উচ্চ রক্তচাপ। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের কারণে, যার অন্যতম প্রধান উৎস এই উচ্চ রক্তচাপ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ হাইপারটেনশনে ভুগছেন। ডব্লিউএইচও’র ২০২৫ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় প্রাণ হারিয়েছেন। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এই বিপুল সংখ্যক মৃত্যুর ৫২ শতাংশেরই প্রধান কারণ ছিল উচ্চ রক্তচাপ। সামগ্রিকভাবে দেশে প্রতি বছর ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদরোগজনিত বিভিন্ন জটিলতায় মারা যাচ্ছেন, যার পেছনে অন্যতম মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ। এটি বর্তমানে দেশে মানুষের মৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের প্রধান তিনটি কারণের একটিতে পরিণত হয়েছে।
‘বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৭-১৮’-এর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রাদুর্ভাব ২০১১ সালের ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে পুরুষের ক্ষেত্রে আক্রান্তের হার ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৪ শতাংশ এবং নারীর ক্ষেত্রে তা ৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে ভীতিকর বিষয় হলো, আক্রান্তদের একটি বিশাল অংশ তাদের এই শারীরিক সমস্যা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসচেতন। উচ্চ রক্তচাপে ভোগা অর্ধেক নারী (৫১ শতাংশ) এবং দুই-তৃতীয়াংশ পুরুষই (৬৭ শতাংশ) জানেন না যে তাদের শরীরে এই রোগ বাসা বেঁধেছে।
তরুণদের এই ঝুঁকির বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বর্তমানে দেশের প্রতি পাঁচ জন তরুণের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। চিপস, আচার, বার্গার, পিৎজা, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত চিনি ও লবণযুক্ত খাবার তরুণদের রক্তচাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, কিশোর-তরুণদের মধ্যে ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। এর পাশাপাশি ধূমপান, মাদক গ্রহণ, মারাত্মক বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণও উচ্চ রক্তচাপের বড় ঝুঁকি হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘ সময় ধরে এক জায়গায় বসে কাজ করেন, তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
মুগদা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. শাহাবুল হুদা চৌধুরী এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, মানুষের বয়স ৫০ বছরের কাছাকাছি পৌঁছালে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপ অথবা এর গুরুতর ঝুঁকিতে পড়েন। তবে বর্তমানের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, তরুণ কর্মজীবীদের মধ্যেও এই রোগের বিস্তার দ্রুত গতিতে বাড়ছে।
একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরীর বক্তব্যেও। তিনি জানান, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের মতো জটিল সমস্যাগুলো এখন আর কেবল প্রাপ্তবয়স্ক বা প্রবীণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চিকিৎসকেরা এখন তরুণদের মধ্যেও এই মারাত্মক প্রবণতা লক্ষ্য করছেন।
তবে চিকিৎসকেরা আশার বাণীও শুনিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ একটি প্রতিরোধযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য ব্যাধি। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, সঠিক সময়ে চিকিৎসকের ফলোআপ, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং সর্বোপরি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের এই ভয়াবহ প্রকোপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
