সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক ক্রুজ শিপে প্রাণঘাতী হান্টা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামের ওলন্দাজ পতাকাবাহী একটি বিলাসবহুল জাহাজে এই সংক্রমণের ঘটনা ঘটে। জাহাজটিতে ২৩টি দেশের যাত্রী ছিলেন। যদিও এই ভাইরাসটি করোনাভাইরাসের মতো দ্রুত ছড়ায় না, তবে এর উচ্চ মৃত্যুঝুঁকি চিকিৎসকদের অত্যন্ত চিন্তায় ফেলেছে।
কোরিয়ান যুদ্ধ থেকে আমাজন
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, হান্টা ভাইরাস মূলত একটি জুনোটিক বা প্রাণীবাহিত ভাইরাস। এটি সাধারণত ইঁদুর বা এই জাতীয় বন্য প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, হান্টা কোনো একক ভাইরাস নয়। এটি আসলে একগুচ্ছ ভাইরাসের সমষ্টি, যা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচিত। দক্ষিণ কোরিয়ার হান্টান নদীর নামানুসারে এই ভাইরাসের নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে কোরিয়ান যুদ্ধের সময় প্রথম এই ভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এই ভাইরাসের একটি নতুন রূপ শনাক্ত হয়। চিকিৎসকেরা এর নাম দেন ‘হান্টা ভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম’ (এইচপিএস)। এই ধরনটি মানুষের ফুসফুসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবে চলমান ক্রুজ শিপের প্রাদুর্ভাবটির জন্য দায়ী হান্টা ভাইরাসের একটি বিশেষ বিপজ্জনক রূপ, যার নাম ‘অ্যান্ডিস ভাইরাস’। এই ধরনটি সাধারণত লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা ও চিলি অঞ্চলে বেশি দেখা যায়।
সংক্রমণ ও লক্ষণ
হান্টা ভাইরাস মূলত ইঁদুরের লালা, মূত্র বা মল থেকে ছড়ায়। ইঁদুরের এসব বর্জ্য শুকিয়ে যখন ধুলার সঙ্গে বাতাসে মিশে যায়, তখন ছড়ায় সংক্রমণ। শ্বাসের মাধ্যমে সেই দূষিত বাতাস মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করলে মানুষ আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া আক্রান্ত ইঁদুরের কামড় লাগলে কিংবা ইঁদুরের বর্জ্য দ্বারা দূষিত কোনো খাবার খেলেও এই রোগ হতে পারে। সাধারণ হান্টা ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। তবে অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে ‘অ্যান্ডিস ভাইরাস’ নামের ধরনটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে। চলতি বছরের ক্রুজ শিপের ঘটনায় চিকিৎসকেরা মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের প্রমাণ পেয়েছেন।
বিজ্ঞানীরা হান্টা ভাইরাসের প্রধান দুটি রূপ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমটি হলো এইচপিএস বা পালমোনারি সিনড্রোম। এতে আক্রান্ত হলে রোগীর তীব্র শ্বাসকষ্ট হয় এবং ফুসফুসে পানি জমে যায়। দ্বিতীয় রূপটি হলো এইচএফআরএস বা হেমোরেজিক ফিভার। এর ফলে রোগীর কিডনি অকেজো হয়ে যায় এবং শরীরের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখা দেয়। এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেকটা সাধারণ ফ্লু বা জ্বরের মতো। যেমন—তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা ও শরীরে ক্লান্তি আসা। তবে কয়েক দিন পার হলে মূল জটিলতা শুরু হয়। তখন তীব্র শ্বাসকষ্ট, কাশি এবং রক্তচাপ মারাত্মকভাবে কমে যায়।
প্রতিকার ও প্রতিরোধ
হান্টা ভাইরাস অত্যন্ত প্রাণঘাতী ও বিপজ্জনক। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মৃত্যুর হার ৩৮ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এর অর্থ হলো, প্রতি ১০ জন আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ৪ জনই মারা যেতে পারেন। সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এই ভাইরাস সঠিকভাবে শনাক্ত করা হয়। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, হান্টা ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক বা কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নিয়ে চিকিৎসা দিতে হয়। সেখানে অক্সিজেন সাপোর্ট এবং অন্যান্য সহায়ক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ করার চেষ্টা করা হয়।
এই রোগ থেকে বাঁচতে চিকিৎসকেরা সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়েছেন। বাড়িঘর ও কর্মক্ষেত্র সব সময় ইঁদুরমুক্ত এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ইঁদুরের উপদ্রব আছে এমন অন্ধকার বা অব্যবহৃত ঘর পরিষ্কার করার সময় সরাসরি ঝাড়ু দেওয়া যাবে না। ঝাড়ু দিলে ধুলা উড়ে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তাই ব্লিচিং পাউডার-মিশ্রিত পানি ব্যবহার করে ঘর মুছতে হবে। ময়লা পরিষ্কারের সময় অবশ্যই মুখে মাস্ক এবং হাতে গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। ঘরের সমস্ত খাবার সব সময় ভালোভাবে ঢেকে রাখা জরুরি। শস্যদানা ও খাবারদাবার নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে। চিকিৎসকেরা ইঁদুর মারার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন। ফাঁদে আটকে, বিষ দিয়ে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে ইঁদুর মারা যাবে না। কারণ এতে ভাইরাসের বিস্তার আরও বাড়তে পারে। তার চেয়ে বরং পরিচ্ছন্নতার দিকেই সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। কোনো জায়গা পরিপাটি ও পরিষ্কার করে রাখা হলে সেখানে ইঁদুর নিজে থেকেই আর আবাসন তৈরি করতে পারে না।
