প্রস্রাবে সামান্য জ্বালাপোড়া বা রাতে বারবার টয়লেটে যাওয়ার মতো বিষয়গুলোকে আমরা সাধারণত গুরুত্ব দিতে চাই না। অনেকেই হালকা কোমর ব্যথা কিংবা তলপেটের অস্বস্তিকে পানিশূন্যতা, বয়স বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত মানসিক চাপ কিংবা সাধারণ কোনো সংক্রমণের ফল বলে ধরে নেন। সাময়িক সমস্যা ভেবে এই লক্ষণগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা আমাদের সমাজে অত্যন্ত বেশি। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের মতে, শরীর অনেক সময় খুব সাধারণ এবং আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ কিছু উপসর্গের মাধ্যমেই ভেতরে দানা বাঁধতে থাকা বড় কোনো বিপদের আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে থাকে।
চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, মূত্রনালির বিভিন্ন ধরনের জটিল ক্যানসার যেমন—ব্লাডার (মূত্রাশয়), কিডনি, প্রোস্টেট কিংবা ইউরেটার ক্যানসার প্রাথমিক অবস্থায় অত্যন্ত নীরবে শরীরের ভেতর শুরু হতে পারে। শুরুর দিকে এই রোগগুলোর লক্ষণ এতটাই সূক্ষ্ম থাকে যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা আঁচ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মাসের পর মাস এই জাতীয় শারীরিক পরিবর্তন বা লক্ষণগুলোকে উপেক্ষা করার চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। অবহেলার কারণে এই রোগটি একপর্যায়ে শরীরের এক অংশ থেকে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। ফলে পরবর্তী সময়ে এর সামগ্রিক চিকিৎসা পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল, দীর্ঘমেয়াদি, ব্যয়বহুল এবং রোগীর পাশাপাশি তার পরিবারের জন্য মানসিকভাবে চরম কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের সংগৃহীত তথ্য ও গবেষণা থেকে জানা যায়, ব্লাডার বা মূত্রাশয় এবং কিডনি ক্যানসার যদি একদম প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তবে তা শরীরে ছড়িয়ে পড়ার আগেই চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় করার বা সাফল্যের মুখ দেখার সম্ভাবনা অনেক গুণ বেশি থাকে।
যেসব উপসর্গকে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, এই রোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক এবং মারাত্মক লক্ষণটি হলো প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া। আপনার যদি জীবনে মাত্র একবারের জন্যও প্রস্রাবের সাথে রক্তপাত হয় এবং তা যদি সম্পূর্ণ ব্যথাহীনও হয়, তবুও এটিকে কোনো অবস্থাতেই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। চিকিৎসকদের মতে, এই একটি লক্ষণই বড় বিপদের ইঙ্গিত হতে পারে। এর পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ রয়েছে যেগুলো দেখা দিলে কোনো ধরনের দেরি না করে দ্রুত অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। লক্ষণগুলো হলো:
ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া।
প্রস্রাব করার সময়ে তীব্র বা মৃদু জ্বালাপোড়া অনুভব করা।
প্রস্রাব ধরে রাখা বা নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হওয়া।
প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রবাহ আগের চেয়ে দুর্বল বা ধীর হয়ে যাওয়া।
বিশেষ করে রাতের বেলা বারবার প্রস্রাবের চাপ অনুভব করা এবং ঘুম ভেঙে যাওয়া।
তলপেট কিংবা পিঠের নিচের অংশে দীর্ঘস্থায়ী ও অস্বস্তিকর ব্যথা থাকা।
ভারতের বিখ্যাত শারদাকেয়ার-হেলথসিটির রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান ডা. অনিল থাকওয়ানি এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন অনেক রোগী আসেন যারা মনে করেন প্রস্রাবজনিত এই সমস্যাগুলো কেবলই বয়স বৃদ্ধি, সাময়িক সংক্রমণ বা অন্য কোনো সাধারণ কারণে হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শরীরে বাসা বেঁধে থাকা এই উপসর্গগুলো আসলে ব্লাডার, কিডনি, প্রোস্টেট কিংবা ইউরেটার ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয়ে অবহেলা বা দেরি হলে পরবর্তী সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে রোগীর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও নাটকীয়ভাবে কমে যায়।’
তিনি আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে জানান যে, এই সমস্যাগুলো জটিল হয়ে ওঠার অন্যতম মূল কারণ হলো, ক্যানসারের এই প্রাথমিক উপসর্গগুলো দেখতে একদম সাধারণ ইউরিন ইনফেকশন (ইউটিআই) কিংবা বয়সজনিত কারণে প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়ার লক্ষণের মতোই মনে হয়। ফলে রোগীরা বিভ্রান্ত হন। এই কারণেই সঠিক সময়ে উপযুক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, কেবল নিয়মমাফিক প্রস্রাব পরীক্ষা (ইউরিন রুটিন এক্সামিনেশন), উন্নত ইমেজিং স্ক্যান কিংবা সিস্টোস্কোপির মাধ্যমেই এই রোগের প্রকৃত কারণ এবং এর গভীরতা নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব।
একই সুর শোনা গেছে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর গাইডলাইনেও। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) ক্যানসার স্ক্রিনিং সংক্রান্ত নির্দেশিকাতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, শরীরের যেকোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শরীরে কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে অবহেলা না করে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
দেরিতে রোগ শনাক্ত হলে ঝুঁকির মাত্রা কতটা বাড়ে
চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতির কল্যাণে বর্তমানে ক্যানসারের চিকিৎসা আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত এবং আধুনিক। তা সত্ত্বেও চিকিৎসকরা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ক্যানসার নিরাময়ের ক্ষেত্রে রোগ শনাক্তকরণের সময়টিই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। মূত্রনালির ক্যানসার যদি একদম শুরুর দিকে বা প্রাথমিক ধাপে ধরা পড়ে, তবে তা অস্ত্রোপচার (সার্জারি), সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক রেডিয়েশন থেরাপি কিংবা অন্যান্য আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে তুলনামূলক অনেক সহজে ও সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ক্যানসার যদি একবার আশপাশের টিস্যু, লিম্ফ নোড বা রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে শরীরের দূরবর্তী কোনো অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে, তখন চিকিৎসা পদ্ধতি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক, কষ্টদায়ক এবং দীর্ঘমেয়াদি হয়ে পড়ে।
ডা. অনিল থাকওয়ানি জোর দিয়ে বলেন, ‘ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো রোগটি প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করতে পারা। দ্রুত রোগ ধরা পড়লে অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন থেরাপি বা অন্যান্য উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমে রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করার বা রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।’ তিনি আধুনিক চিকিৎসার অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে আরও জানান, বর্তমানে আধুনিক রেডিয়েশন প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক বেড়েছে। এর মাধ্যমে এখন মানবদেহের টিউমারকে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে লক্ষ্য করে থেরাপি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে টিউমারের আশপাশে থাকা শরীরের সুস্থ টিস্যুগুলোর ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম হয়। তবে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা পুরোপুরি নির্ভর করে ক্যানসার কত দ্রুত বা কত আগে ধরা পড়ছে তার ওপর।
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনাতেও চিকিৎসায় বিলম্বের ভয়াবহতার কথা উঠে এসেছে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ক্যানসার শনাক্তকরণে সামান্য বিলম্ব হলেও চিকিৎসার চূড়ান্ত ফলাফল খারাপ হওয়ার বা রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়।
কারা রয়েছেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার জানা থাকা ভালো যে, প্রস্রাবজনিত সব সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরই ক্যানসার হবে—এমন কোনো কথা নেই। তবে কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ এই রোগের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। বিশেষ করে যাদের বয়স ৫০ বছর পার হয়েছে, যারা নিয়মিত ধূমপান বা তামাকজাত দ্রব্য সেবন করেন, যারা বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানার ক্ষতিকর রাসায়নিক বা কেমিক্যালের সংস্পর্শে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেন এবং যাদের পরিবারে বা বংশে অতীতে মূত্রনালির ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে তামাকের ব্যবহার বা ধূমপান করা ব্লাডার বা মূত্রাশয়ের ক্যানসার সৃষ্টির অন্যতম প্রধান ও অন্যতম শীর্ষ কারণ হিসেবে বিশ্বজুড়ে প্রমাণিত।
লজ্জা ও সংকোচই ডেকে আনছে বড় বিপদ
আমাদের সমাজব্যবস্থায় প্রস্রাবজনিত যেকোনো সমস্যা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে অনেকেই চরম অস্বস্তি ও দ্বিধাবোধ করেন। সামাজিক লজ্জা বা সংকোচের কারণে বহু মানুষ মাসের পর মাস এই ধরনের কষ্টদায়ক উপসর্গ মুখ বুজে সহ্য করেন। তারা মনে মনে আশা করেন যে, সমস্যাটি হয়তো সাময়িক এবং কিছুদিনের মধ্যে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই গোপন করার মানসিকতা বা নীরবতাই এক সময় রোগীর জন্য সবচেয়ে বড় জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিয়মিত বিরতিতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা (হেলথ চেকআপ) করানোর সংস্কৃতি এখনও খুব একটা গড়ে ওঠেনি। ফলে রোগীরা সাধারণত তখনই চিকিৎসকের চেম্বারে বা হাসপাতালে আসেন, যখন রোগটি চরম আকার ধারণ করে এবং উপসর্গগুলো তাদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় গুরুতর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। কিন্তু ততক্ষণে রোগটি শরীরের ভেতরে অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা শুরুর ক্ষেত্রে অনেক দেরি হয়ে যায়।
শরীরের দেওয়া সংকেতকে অবহেলা করবেন না
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে বলছেন যে, মানবদেহ কখনো অকারণে বা বিনা কারণে নিজের ভেতরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটায় না। শরীরে কোনো অস্বস্তি বা উপসর্গ যদি বারবার ফিরে আসে বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তার মানে হলো এটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। চিকিৎসকদের চূড়ান্ত পরামর্শ হলো—প্রস্রাবজনিত যেকোনো ধরনের অস্বাভাবিক লক্ষণ যদি কয়েক দিনের চেয়ে বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয় কিংবা মাঝেমধ্যেই ফিরে আসে, তবে কোনো ধরনের টোটকা বা ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর ভরসা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এছাড়া, বয়স ৪০ বা ৫০ বছর পার হওয়ার পর প্রত্যেকেরই উচিত নিয়মিত বিরতিতে নির্দিষ্ট কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা। এটি শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা যেকোনো গোপন রোগকে একদম আগেভাগে বা প্রাথমিক স্তরেই শনাক্ত করতে জাদুকরী সাহায্য করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মনের লজ্জা বা সামাজিক সংকোচকে কখনোই নিজের জীবন বা রোগ নির্ণয়ের পথে বাধা হতে দেওয়া উচিত নয়। আজকের সচেতনতা এবং ছোট একটি সঠিক চিকিৎসা পরামর্শ আপনাকে ভবিষ্যতের একটি বড়, দীর্ঘ ও কঠিন শারীরিক-মানসিক লড়াই থেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারে।
