বংশগত রক্তরোগ থ্যালাসেমিয়া বর্তমানে দেশের অন্যতম একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য কিন্তু নীরব ঘাতক ব্যাধি। চিকিৎসকদের মতে, কেবল সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক সময়ে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই এই রোগটি পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই রোগটির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন দেশের বিশিষ্ট রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ, বোন-ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট ফিজিশিয়ান এবং বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতির উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. এম এ খান। তিনি জানান, থ্যালাসেমিয়া মূলত একটি জিনগত বা বংশগত রোগ। মানবদেহের ১১ ও ১৬ নম্বর ক্রোমোজোমের জিনগত ত্রুটির (মিউটেশন বা ডিলেশন) কারণে এই রোগটি হয়। এর ফলে শরীরে স্বাভাবিকভাবে হিমোগ্লোবিন তৈরি হতে পারে না। আবার অনেক সময় হিমোগ্লোবিন তৈরি হলেও তা বিকৃত আকৃতির হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘হিমোগ্লোবিনোপ্যাথি’ বলা হয়ে থাকে। শরীরে ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন থাকার কারণে রক্তে স্বাভাবিক অক্সিজেন চলাচল ব্যাহত হয়। এর ফলে লোহিত রক্তকণিকাগুলো নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ভেঙে যায়। যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে রোগীর শরীরে তীব্র রক্তশূন্যতা ও জন্ডিস দেখা দেয়।
বিশ্বব্যাপী যে কয়েকটি রোগ সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়েছে, থ্যালাসেমিয়া তার মধ্যে অন্যতম। সারা বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের থ্যালাসেমিয়া রোগী দেখা গেলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ‘হিমোগ্লোবিন-ই’ (এইচবি-ই) এবং ‘হিমোগ্লোবিন-বিটা’ (এইচবি-বিটা) থ্যালাসেমিয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। জাতীয় থ্যালাসেমিয়া জরিপ-২০২৪ এর সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ এই রোগের বাহক বা কেরিয়ার। সংখ্যার হিসাবে যা প্রায় ২ কোটির কাছাকাছি। এই বাহকদের মধ্যে ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ হিমোগ্লোবিন-ই, ২.১২ শতাংশ হিমোগ্লোবিন-বিটা এবং দশমিক ৬৯ শতাংশ অন্যান্য ধরনের থ্যালাসেমিয়ার বাহক। দেশে প্রতি বছর ১১ হাজারেরও বেশি শিশু থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে।
অধ্যাপক ডা. এম এ খান জানান, বাবা এবং মা দুজনেই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তবে তাদের সন্তানদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। এমন দম্পতির সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে প্রতিবারই থ্যালাসেমিক শিশু জন্মের সম্ভাবনা থাকে ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ চার সন্তানের মধ্যে অন্তত একজনের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে সন্তান বাহক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে অনেক দুর্ভাগ্যজনক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো কোনো পরিবারের সবকটি শিশুই থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্ম নিচ্ছে।
সাধারণত একটি শিশুর জন্মের ৬ মাস থেকে ১ বছর বয়সের মধ্যে এই রোগের লক্ষণগুলো প্রথম প্রকাশ পায়। এর প্রধান উপসর্গ হলো মারাত্মক রক্তশূন্যতা। এছাড়া চোখ ও শরীর হলুদ হয়ে যাওয়া বা জন্ডিস দেখা দেওয়া, প্লীহা বড় হয়ে যাওয়ার কারণে পেট মোটা হওয়া এবং চেহারার পরিবর্তন বা ‘মঙ্গোলিয়ান ফেসিস’ দেখা দেয়। আক্রান্ত শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এছাড়া বারবার রক্ত নেওয়ার কারণে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন বা লোহা জমা হতে থাকে। এই বাড়তি আয়রনের ফলে রোগীর লিভার (সিরোসিস), হার্ট (কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথি) এবং এন্ড্রোক্রাইন গ্রন্থির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসা মূলত দুই ধরনের। প্রথমটি হলো মেডিকেল বা সাপোর্টিভ চিকিৎসা। এর প্রধান অংশ হলো রোগীকে নিয়মিত এবং পরিমিত রক্ত পরিসঞ্চালন (ব্লাড ট্রান্সফিউশন) করা। একজন রোগীর ঠিক কী পরিমাণ রক্ত লাগবে তা নির্ভর করে তার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, শরীরের ওজন এবং দাতার রক্তের হিমাটোক্রিটের ওপর। নিয়মিত রক্ত দিলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও প্লীহা স্বাভাবিক থাকে। তবে রক্ত নেওয়ার পাশাপাশি শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত আয়রন ওষুধের মাধ্যমে বের করে দেওয়া জরুরি, যাকে ‘আয়রন চিলেশন’ বলা হয়। সাধারণত রক্তে ফেরিটিনের পরিমাণ ১ হাজার মাইক্রোগ্রাম/মিলি হলে কিংবা ২০-২৫ ব্যাগ রক্ত নেওয়া হয়ে গেলে চিকিৎসকরা নিয়মিত আয়রন চিলেটিং ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
এছাড়া রক্তশূন্যতা কমাতে ‘হাইড্রক্সিইউরিয়া’ এবং ‘থ্যালিডোমাইড’ জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এগুলো শরীরে এইচবি-এফ এর উৎপাদন বাড়িয়ে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কিছুটা বৃদ্ধি করে, যা রক্তের চাহিদাকে কমিয়ে আনে। উন্নত বিশ্বে ব্লাড ট্রান্সফিউশনের বিকল্প হিসেবে ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ‘লুসপ্যাটারসেপ্ট’ নামের একটি নতুন ইনজেকশন ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ওষুধটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় আমাদের দেশে এখনও সহজলভ্য নয়।
মেডিকেল চিকিৎসার পাশাপাশি এই রোগের একটি স্থায়ী নিরাময়মূলক বা কিউরেটিভ চিকিৎসাও রয়েছে। সেটি হলো বোন-ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন বা স্টেমসেল ট্রান্সপ্লান্টেশন। থ্যালাসেমিয়া থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় এটিই। বিশেষ করে অল্পবয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসার সফলতার হার প্রায় ৮০ শতাংশ। ২০১২ সালের একটি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি মেডিকেল চিকিৎসার তুলনায় এই ‘অ্যালোজেনিক বোন-ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন’ অনেক বেশি সাশ্রয়ী। তবে বাংলাদেশে এর চিকিৎসা ব্যয় অনেক উচ্চ। একই সাথে উপযুক্ত স্টেমসেল দাতার সংকট এবং বিশেষায়িত হাসপাতালের অভাব থাকায় এই স্থায়ী চিকিৎসাটি এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। অন্যদিকে, যারা কেবল থ্যালাসেমিয়ার বাহক (মাইনর), তাদের কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তারা দেহের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে আয়রনযুক্ত খাবারসহ সব ধরনের স্বাভাবিক খাবার খেতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসার চেয়ে এটি প্রতিরোধ করাই সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী পথ। বাংলাদেশে এই রোগ এবং এর বাহকের সংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ হলো রোগটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের চরম অজ্ঞতা। এছাড়া দুজন বাহকের মধ্যে বিয়ে হওয়া এবং পারিবারিক আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের প্রবণতা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই নীরব ঘাতক থেকে বাঁচতে বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। প্রথমত, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ব্যাপকভাবে বাহক শনাক্তকরণ বা স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিয়ের আগে বাধ্যতামূলকভাবে বা উৎসাহিত করে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করানো দরকার। যদি স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বাহক হন, তবে সন্তান গর্ভে আসার ১০ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে ‘প্রিন্যাটাল’ বা জন্মপূর্ব পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি দেশজুড়ে জেনেটিক কাউন্সিলিং সেবা সম্প্রসারণ, সামাজিক প্রচারণা বৃদ্ধি এবং পাঠ্যপুস্তকে থ্যালাসেমিয়া বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
আক্রান্ত রোগীদের জীবনযাত্রার ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। যেহেতু তারা নিয়মিত রক্ত ও ওষুধ নিয়ে বেঁচে থাকেন, তাই তারা শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল হন এবং তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। এই কারণে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের অতিরিক্ত কায়িক পরিশ্রমের কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। তাদের পুষ্টিকর কিন্তু কম আয়রনযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একজন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি যখন জীবনসঙ্গী নির্বাচন করবেন, তখন তাকে অবশ্যই এমন একজনকে বিয়ে করতে হবে যিনি এই রোগের বাহক নন। এতে করে তাদের পরবর্তী সন্তানরা থ্যালাসেমিয়া রোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে।
চিকিৎসক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, থ্যালাসেমিয়া কেবল একটি চিকিৎসাগত সমস্যা নয়, এটি একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ। এই রোগকে সমাজ থেকে দূর করতে হলে সরকার, চিকিৎসক, গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ এবং সর্বস্তরের সচেতন নাগরিক সমাজকে একসাথে মিলে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
