ক্যান্সার চিকিৎসায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি সেবায় নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। গত ১৫ই মে হো চি মিন সিটি অনকোলজি হাসপাতালে আয়োজিত এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। ২০২৬ সালের এই বিশেষ সম্মেলনে ‘নতুন যুগে ক্যান্সার রোগীর যত্নের সমন্বিত পন্থা’ শীর্ষক প্রতিপাদ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভিয়েতনামের পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের প্রায় ৫০০ বিশেষজ্ঞ এই আলোচনা সভায় যোগ দেন।
দেরিতে শনাক্তকরণই বড় চ্যালেঞ্জ
সম্মেলনের মূল আয়োজক ও হো চি মিন সিটি অনকোলজি হাসপাতালের পরিচালক ড. দিয়েপ বাও তুয়ান জানান, ভিয়েতনামে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার বিশ্ব প্রেক্ষাপটে খুব বেশি না হলেও মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। এর মূল কারণ রোগ শনাক্ত করতে অনেক দেরি হওয়া। ২০২২ সালের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি জানান, ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ রোগীই ক্যান্সার যখন তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন হাসপাতালে আসেন। ফলে চিকিৎসা কার্যকর হওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম
বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা খাত চিকিৎসা দেওয়ার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ ও শুরুতে রোগ শনাক্ত করার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ড. তুয়ান বলেন, প্রথম দিকে ক্যান্সার ধরা পড়লে চিকিৎসার খরচ যেমন কমে, তেমনি সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। তিনি প্রত্যেকের জন্য বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে যারা অতিরিক্ত ধূমপান করেন, দূষিত এলাকায় থাকেন বা যাদের পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস আছে, তাদের নিয়মিত স্ক্রিনিং করানো জরুরি। বর্তমানে হাসপাতালটি একটি আদর্শ মানদণ্ড তৈরির লক্ষ্যে শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে কাজ করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ম্যাজিক: ৪ ঘণ্টার কাজ ২ মিনিটে
এবারের সম্মেলনের প্রধান চমক ছিল চিকিৎসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রয়োগ। ড. তুয়ানের মতে, এআই এখন ডাক্তারদের সবচেয়ে শক্তিশালী সহায়ক। আগে একজন রোগীর রেডিয়েশন থেরাপির পরিকল্পনা করতে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের প্রায় ৪ ঘণ্টা সময় লাগত। এখন এআই ব্যবহার করে মাত্র ২ মিনিটে তা করা সম্ভব হচ্ছে। শুধু সময় বাঁচানোই নয়, এআই মানুষের ভুলের সম্ভাবনা কমিয়ে নিখুঁতভাবে রোগ নির্ণয় করছে। বর্তমানে হাসপাতালটি ফুসফুসের সিটি স্ক্যান এবং টার্গেটেড থেরাপির জন্য এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এছাড়া এটি স্তন ও পাকস্থলীর ক্যান্সারের জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করতেও সাহায্য করছে।
ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন
আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি ভিয়েতনামীরা এখন ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে ড. তুয়ান সতর্ক করে বলেন, এই পদ্ধতি ক্যান্সার নিরাময় করে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কিন্তু এটি রোগীদের শারীরিক শক্তি বাড়াতে ও কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতে দারুণ কার্যকর। ২০২৫ সালে এই হাসপাতালে একটি বিশেষ বিভাগ খোলা হয়েছে যেখানে আকুপাংচার ও ম্যাসাজের মতো পদ্ধতির মাধ্যমে রোগীদের সেবা দেওয়া হয়। এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৬ শতাংশ ক্যান্সার রোগীর এই ধরনের সহায়ক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। তবে চিকিৎসকরা ভুয়া বা জাদুকরী নিরাময়ের পেছনে না ছুটে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও নতুন আশা
বিশেষজ্ঞরা জানান, ক্যান্সারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কারণ আমাদের জীবনযাত্রার পরিবেশের সাথে যুক্ত। তাই সঠিক খাদ্যভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ এবং সংরক্ষিত খাবার এড়িয়ে চলার মাধ্যমে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। সবশেষে ড. তুয়ান একটি সুখবর দেন। তিনি জানান, সরকার স্বাস্থ্য বীমার আওতায় ক্যান্সারের নতুন ওষুধের তালিকা আরও বড় করার পরিকল্পনা করছে। এর ফলে রোগীরা নতুন ও উন্নত চিকিৎসা সেবা আরও সস্তায় পাবেন এবং চিকিৎসকরাও আত্মবিশ্বাসের সাথে সেবা দিতে পারবেন।
এই সম্মেলনের মাধ্যমে এটি পরিষ্কার যে, আগামী দিনে ক্যান্সার মোকাবিলায় প্রযুক্তি, সঠিক জীবনযাপন এবং সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতিই হবে মূল ভরসা।
