দেখতে ছোটখাটো গাছের মতো সবুজ রঙের সবজি ব্রকলি। এটি মূলত ‘ব্রাসিকা ওলেরেসিয়া’ উদ্ভিদ প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। সাধারণ মানুষের পরিচিত বাঁধাকপি, ওলকপি, ফুলকপি ও কলমি শাকের সঙ্গে এই সবজির বেশ মিল রয়েছে। এগুলোকে বিজ্ঞানের ভাষায় ক্রুসিফেরাস গোত্রের সবজি বলা হয়। বাজারে সাধারণত তিন ধরনের ব্রকলি বেশি দেখা যায়। এগুলো হলো ক্যালাব্রেস ব্রকলি, স্প্রাউটিং ব্রকলি এবং পার্পল ফুলকপি। শেষোক্তটির নাম ফুলকপি হলেও এটি আসলে এক বিশেষ জাতের ব্রকলি। নিয়মিত ব্রকলি খাওয়ার প্রধান ১৪টি স্বাস্থ্য উপকারিতা নিচে তুলে ধরা হলো।
১. পুষ্টি উপাদানের সমৃদ্ধ ভান্ডার
ব্রকলির সবচেয়ে বড় গুণ হলো এর উচ্চ পুষ্টিমান। এতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ, আঁশ ও নানাবিধ জৈব যৌগ প্রচুর পরিমাণে থাকে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা ব্রকলিতে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা থাকে ৬ গ্রাম এবং প্রোটিন থাকে ২.৬ গ্রাম। অপরদিকে চর্বির পরিমাণ মাত্র ০.৩ গ্রাম এবং আঁশ থাকে ২.৪ গ্রাম। এছাড়া দৈনিক চাহিদার ৯০ শতাংশ ভিটামিন সি, ৩ শতাংশ ভিটামিন এ এবং ৭৭ শতাংশ ভিটামিন কে মিলবে এই সবজিতে। একই সাথে দৈনিক চাহিদার ১৪ শতাংশ ভিটামিন বি৯ বা ফোলেট, ৬ শতাংশ পটাশিয়াম, ৫ শতাংশ ফসফরাস ও ৪ শতাংশ সেলেনিয়াম পাওয়া যায় ব্রকলি থেকে।
২. রান্নার পদ্ধতি ও গুনাগুণ
ব্রকলি রান্না করে কিংবা কাঁচা—উভয়ভাবেই খাওয়া যায়। তবে দুই পদ্ধতিতে পুষ্টির বিন্যাসে কিছুটা তারতম্য ঘটে। সেদ্ধ করা, মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার, অতিরিক্ত তেলে ভাজা কিংবা ভাপে সিদ্ধ করার কারণে এই সবজির পুষ্টি উপাদান পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে ভিটামিন সি, দ্রবণীয় প্রোটিন ও শর্করার পরিমাণ এসব কারণে কমে যেতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, ভাপে বা স্টিম করে রান্না করলে ব্রকলির পুষ্টির ক্ষতি সবচেয়ে কম হয়।
৩. রোগ প্রতিরোধে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
ব্রকলিতে থাকা প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এই উপাদানটি শরীরের কোষের ক্ষতি রুখে দেয় এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। ব্রকলিতে উচ্চ মাত্রার ‘গ্লুকোরাফানিন’ থাকে, যা হজমের সময় ‘সালফোরাফেন’ নামক শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে রূপান্তরিত হয়। ল্যাবরেটরি ও প্রাণীর ওপর করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই উপাদানটি রক্তে শর্করার মাত্রা ও কোলেস্টেরল কমায়। একই সাথে এটি মানসিক চাপ দূর করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে। তবে মানুষের ওপর এর কার্যকারিতা পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে আরও গবেষণার প্রয়োজন। এছাড়া এতে থাকা লিউটিন ও জেক্সানথিন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট চোখের কোষ রক্ষা করে।
৪. শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ হ্রাস
মানবদেহের ভেতরের টিস্যুর প্রদাহ কমাতে ব্রকলির বিভিন্ন জৈব যৌগ দারুণ ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর ভেতরের একাধিক উপাদান একসঙ্গে মিলে শরীরের রোগ প্রতিরোধে কাজ করে। ধূমপায়ীদের নিয়ে করা একটি সংক্ষিপ্ত গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ব্রকলি খাওয়ার ফলে তাদের শরীরের প্রদাহের লক্ষণগুলো উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তবে মানুষের শরীরে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিশ্চিত করতে আরও নিবিড় গবেষণার অবকাশ রয়েছে।
৫. ক্যানসার প্রতিরোধের সম্ভাবনা
ক্রুসিফেরাস গোত্রের সবজি হিসেবে ব্রকলিতে এমন কিছু উপাদান আছে, যা দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণে হওয়া কোষের ক্ষতি প্রতিরোধ করে। কিছু ছোট গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ব্রকলি খেলে স্তন, প্রোস্টেট, গ্যাস্ট্রিক বা পাকস্থলী, কোলোরেক্টাল, কিডনি ও মূত্রাশয়ের ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য হতে পারে। অবশ্য ক্যানসার নিরাময় বা প্রতিরোধে ব্রকলির একক ভূমিকা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো দাবি করা সমীচীন নয় বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
৬. রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধ
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্রকলি দারুণ কার্যকর। এর সুনির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি জানা না গেলেও ধারণা করা হয় যে, এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানই এর জন্য দায়ী। এক গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এক মাস ধরে প্রতিদিন ব্রকলির চারা বা স্প্রাউট খাওয়ার পর তাদের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। ল্যাবরেটরির ইঁদুরের ওপর করা অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রকলির রস অগ্ন্যাশয়ের কোষের ক্ষতি কমায় এবং রক্তের শর্করা হ্রাস করে। তদুপরি, ব্রকলিতে থাকা খাদ্যআঁশ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত সহায়ক।
৭. হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা
হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ হলো শরীরে ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের আধিক্য। ব্রকলি এই ক্ষতিকর উপাদানগুলো কমাতে সাহায্য করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রকলির চারা থেকে তৈরি গুঁড়ো বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ফলে মানুষের শরীরের ট্রাইগ্লিসারাইড ও খারাপ কোলেস্টেরল কমেছে এবং ভালো এইচডিএল কোলেস্টেরল বেড়েছে। ২০১৭ সালের এক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্রকলি হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে অত্যন্ত কার্যকর। ইঁদুরের ওপর করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, ব্রকলি দীর্ঘায়ু লাভে সাহায্য করে, রক্তচাপ কমায় এবং গ্লুকোজ সহনশীলতা বাড়ায়। এর উচ্চ আঁশযুক্ত উপাদান হৃদপিণ্ড ভালো রাখে।
৮. উন্নত পরিপাকতন্ত্র ও পেটের স্বাস্থ্য
পরিপাকতন্ত্র সুস্থ রাখতে ব্রকলির আঁশ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। এটি অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করে। ইঁদুরের ওপর করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, ব্রকলি খাওয়ার ফলে কোলনের প্রদাহ কমেছে। সুস্থ মানুষের ওপর ১৮ দিন ধরে করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রকলি খাওয়ার ফলে তাদের পেটের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ৯ শতাংশ কমেছে এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়া ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭ সালের অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ব্রকলি খান, তাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর হয় এবং মলত্যাগ সহজ হয়।
৯. মানসিক কার্যকারিতা বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের সুরক্ষা
ব্রকলির পুষ্টি উপাদান মস্তিষ্কের কার্যকারিতা সচল রাখে এবং বয়সজনিত মানসিক অবক্ষয় রোধ করে। ৯৬০ জন প্রবীণ ব্যক্তির ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে মাত্র এক বেলা ব্রকলির মতো গাঢ় সবুজ সবজি খেলে তা বার্ধক্যজনিত স্মৃতিভ্রম রোধে সাহায্য করে। ব্রকলিতে থাকা ‘ক্যাম্পফেরল’ নামক যৌগটি স্ট্রোক বা মস্তিষ্কের আঘাতজনিত প্রদাহ থেকে রক্ষা করে। এছাড়া এর ‘সালফোরাফেন’ নামক উপাদানটি মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং বিষাক্ত পদার্থের আক্রমণ থেকে মস্তিষ্ককে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে। তবে এ সংক্রান্ত অধিকাংশ তথ্যই এখন পর্যন্ত প্রাণীদের ওপর পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।
১০. বার্ধক্য প্রতিরোধে ভূমিকা
মানুষের বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াটি মূলত অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং বিপাকীয় কার্যকারিতা হ্রাসের সাথে জড়িত। বয়স বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এর গতি ধীর করা সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রকলির প্রধান উপাদান ‘সালফোরাফেন’ শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট জিন সক্রিয় করার মাধ্যমে বার্ধক্যের জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে ধীরগতির করতে পারে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এর চূড়ান্ত কার্যকারিতা জানতে আরও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রয়োজন রয়েছে।
১১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
মানবদেহের জটিল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে নানাবিধ পুষ্টির প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ভিটামিন সি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যা ব্রকলিতে প্রচুর পরিমাণে থাকে। গবেষণা অনুযায়ী, সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি গ্রহণ করা প্রয়োজন। সাধারণত ভিটামিন সি-এর জন্য মানুষ কমলা বা স্ট্রবেরি বেছে নিলেও আধা কাপ সিদ্ধ ব্রকলি থেকেই দৈনিক চাহিদার প্রায় ৫৬ শতাংশ ভিটামিন সি পাওয়া সম্ভব।
১২. মুখের ও দাঁতের স্বাস্থ্য রক্ষা
মুখের ভেতরের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং দাঁতের রোগ প্রতিরোধে ব্রকলি বেশ উপকারী। এতে থাকা ভিটামিন সি ও ক্যালসিয়াম দাঁতের মাড়ির রোগ বা পেরিওডন্টাল রোগের ঝুঁকি কমায়। ব্রকলির ‘ক্যাম্পফেরল’ মাড়ির সুরক্ষায় কাজ করে এবং ‘সালফোরাফেন’ মুখের ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস করে। কেউ কেউ দাবি করেন যে কাঁচা ব্রকলি চিবিয়ে খেলে দাঁতের প্লাক দূর হয় ও দাঁত সাদা হয়, তবে এর কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
১৩. হাড় ও জয়েন্টের সুস্থতা
হাড়ের গঠন মজবুত করতে এবং হাড়ের নানাবিধ রোগ প্রতিরোধে ব্রকলির পুষ্টি উপাদান ভূমিকা রাখে। এটি ভিটামিন কে এবং ক্যালসিয়ামের অন্যতম সেরা উৎস। এছাড়া হাড়ের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ফসফরাস, জিঙ্ক এবং ভিটামিন এ ও সি রয়েছে এই সবজিতে। ২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রকলির সালফোরাফেন উপাদানটি হাড়ের ক্ষয়কারী কোষগুলোকে বাধা দেয়। ফলে এটি অস্টিওআর্থারাইটিস এবং অস্টিওপোরোসিসের মতো জটিল রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
১৪. গর্ভবতী মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা
গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ ও প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। ব্রকলি হলো ভিটামিন বি৯ বা ফোলেটের চমৎকার উৎস। গর্ভস্থ শিশুর মস্তিষ্ক এবং কর্ড বা মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য ফোলেট একটি অপরিহার্য উপাদান। নিয়মিত ব্রকলি খেলে গর্ভাবস্থার জটিলতা এড়ানো সহজ হয়। ল্যাবরেটরির প্রাণীদের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় ব্রকলি খেলে তা নবজাতকের মানসিক বিকাশেও সহায়তা করে।
পরিশেষে বলা যায়, ব্রকলি একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর সবজি যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল একটি নির্দিষ্ট খাবার খেয়েই পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা লাভ সম্ভব নয়। ব্রকলিকে সুষম খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমেই স্বাস্থ্য লক্ষ্য অর্জন করা সহজ হবে।
