বাংলাদেশে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত লবণের ব্যবহার এখন বড় এক আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) নির্ধারিত সীমার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ লবণ গ্রহণ করছেন এ দেশের মানুষ। ফলে হু হু করে বাড়ছে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের মতো মরণব্যাধি।
বুধবার (১৩ মে) বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এই ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রশিক্ষণ কক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কারিগরি সহায়তা দেয় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট। সেমিনারে বক্তারা জানান, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ৫ গ্রামের বেশি লবণ খাওয়া উচিত নয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মানুষ গড়ে প্রতিদিন ৯ গ্রাম করে লবণ খাচ্ছেন।
ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের (আইএইচএমই) তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রায় ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে শুধুমাত্র খাবারে অতিরিক্ত সোডিয়াম বা লবণের কারণে। দিন দিন এই মৃত্যুর হার আরও বাড়ছে।
সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধগুলোতে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে অসংক্রামক রোগের বড় কারণ এই লবণ। ২০২৩ সালে উচ্চ রক্তচাপের কারণে বিশ্বে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ মারা গেছেন। এর মধ্যে ১৬ লাখ ৭০ হাজার মৃত্যুর সরাসরি কারণ ছিল অতিরিক্ত সোডিয়ামযুক্ত খাদ্যাভ্যাস। বাংলাদেশও এই ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার মানুষ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে প্রাণ হারাচ্ছেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশই এখন অসংক্রামক রোগজনিত। এর মধ্যে ৫১ শতাংশই হলো অকাল মৃত্যু। বিশেষ করে হৃদরোগ বর্তমানে দেশের একক বৃহত্তম ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৩৪ শতাংশের জন্য দায়ী। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার ফলে উচ্চ রক্তচাপ তৈরি হয়, যা হৃদরোগের মূল কারণ।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় লবণ কমানোর বিষয়টি অত্যন্ত সহজ ও সাশ্রয়ী একটি সমাধান। রান্নায় লবণের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি খাবারের টেবিলে আলগা লবণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সেমিনারে প্রস্তাবিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো:
প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণের পরিমাণ কমাতে শিল্প খাতের জন্য কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন।
স্কুল, হাসপাতাল ও কর্মস্থলের ক্যান্টিনে কম লবণযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
খাবারের প্যাকেটের সামনে ‘ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং’ ব্যবস্থা চালু করা, যাতে ক্রেতারা উচ্চ লবণযুক্ত খাবার সহজেই চিনতে পারেন।
ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানো এবং মানুষের লবণ গ্রহণের হার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।
অনেকেই মনে করেন লবণ ছাড়া খাবার বিস্বাদ হবে। তবে সেমিনারে জানানো হয়, লবণের বিকল্প হিসেবে রসুন, আদা, গোলমরিচ, ওরেগানো, ধনিয়া, দারুচিনি, ভিনেগার ও লেবুর মতো প্রাকৃতিক ভেষজ ব্যবহার করা যায়। এতে খাবারের স্বাদও বাড়ে এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকিও কমে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহমেদ। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বিএফএসএর সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।
