দেশে হামে আক্রান্ত রোগীদের ৯৫ শতাংশ সুস্থ হয়ে ফিরলেও নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে এর পরবর্তী শারীরিক জটিলতা। বিশেষ করে হামের রেশ ধরে আসা নিউমোনিয়া শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। বর্তমানে দেশে হামে মৃত্যুর হার ১ শতাংশের নিচে (০.৮%) থাকলেও হাম-উত্তর নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ এই নিউমোনিয়া।
শুক্রবার (১৫ মে) রাজধানীর শাহবাগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসকরা এসব তথ্য জানান। শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে ‘হাম জনিত নিউমোনিয়া- বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও করণীয়’ শীর্ষক এই সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন ডা. গোলাম সরোয়ার।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৪ হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যাচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৬৬টি শিশু এই রোগে প্রাণ হারাচ্ছে। শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন জানান, দেশে হামের টিকার কভারেজ ৯৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। হামে আক্রান্তদের বড় অংশ সুস্থ হলেও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়া ৫ শতাংশ রোগীর মৃত্যু ঘটছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, শিশুদের মায়ের বুকের দুধ না খাওয়ানো, কৌটার দুধের ওপর নির্ভরতা এবং ভিটামিন ‘এ’-র অভাবই নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, শরীরে পুষ্টির অভাব থাকলে হামের তীব্রতা বেড়ে যায়। হাম আক্রান্ত শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় তারা সহজেই অন্য রোগে আক্রান্ত হয়। তিনি অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের সমালোচনা করে বলেন, মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই দোকান থেকে ওষুধ খাওয়ায় এখন শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। সময়মতো অক্সিজেন সহায়তা নিশ্চিত করতে পারলে হামে মৃত্যু অনেক কমানো সম্ভব। তিনি আরও জানান, বর্তমানে কেবল হাম নয়, বরং ‘এমিনো ভাইরাস’-এর কারণেও নিউমোনিয়া ছড়াচ্ছে। তবে এতে আতঙ্কিত না হয়ে আগামী দুই-তিন সপ্তাহ বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন তিনি।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন এভারকেয়ার হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট অধ্যাপক ডা. জিয়াউল হক। তিনি বলেন, হামজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো শ্বাসতন্ত্র বিকল হয়ে যাওয়া। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন এবং চেষ্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ দেশব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ শুরু করেছে। চিকিৎসকরা সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। ডা. জিয়াউল আরও জানান, হামের পাশাপাশি বর্তমানে গুটি বসন্তের প্রাদুর্ভাবও দেখা যাচ্ছে। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে হলেও সঠিক চিকিৎসায় ৯৯ শতাংশ রোগী সুস্থ হওয়া সম্ভব।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কাছে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এগুলো হলো: অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হামের টিকাদান কর্মসূচি চালু রাখা; উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ‘ফিভার কর্নার’ স্থাপন করা; হামপ্রবণ এলাকাগুলো দ্রুত শনাক্ত করা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত চিকিৎসা নির্দেশিকা বা গাইডলাইন দেশের প্রতিটি প্রান্তের স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই হাম ও নিউমোনিয়ার এই ঝুঁকি থেকে শিশুদের রক্ষা করা সম্ভব।
