ঈদুল আজহা দরজায় কড়া নাড়ছে। এরই মধ্যে জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট। তবে এবার পশুর হাটে যাওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তীব্র তাপদাহ ও দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে হাটের পরিবেশ এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। একটু অসচেতনতায় পশুর হাট থেকে মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই হাটে যাওয়ার আগে ও হাটে অবস্থানকালীন সময়ে কিছু জরুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা আবশ্যক।
গরমে পানিশূন্যতা ও হিট স্ট্রোক প্রতিরোধ
প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় হাটে অবস্থান করলে শরীরে দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এমনকি তীব্র গরমে হিট স্ট্রোকের মতো মারাত্মক জীবনঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হওয়াও বিচিত্র নয়।
নিরাপদ পানি: হাটে যাওয়ার সময় অবশ্যই ঘর থেকে বোতলভর্তি নিরাপদ পানি সাথে রাখুন। বিশেষ করে হাটের বিক্রেতারা, যারা দিনরাত সেখানে অবস্থান করছেন, তাদের নিয়মিত বিরতিতে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে।
পোশাক ও সুরক্ষা: রোদের তীব্রতা থেকে বাঁচতে ছাতা ও সানগ্লাস ব্যবহার করুন। হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতি কাপড় পরিধান করা এই আবহাওয়ায় সবচেয়ে আরামদায়ক।
খাদ্যাভ্যাস: হাটে থাকাকালীন চা বা কফি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন, কারণ এগুলো শরীরকে আরও পানিশূন্য করে তোলে। অতিরিক্ত ঘাম হলে সাধারণ পানির পাশাপাশি খাবার স্যালাইন মিশ্রিত পানি পান করুন।
ছায়াযুক্ত স্থান: হাটের ভেতর অযথা দীর্ঘ সময় ঘোরাঘুরি না করে দ্রুত দামদর সম্পন্ন করুন। কাজ শেষে যত দ্রুত সম্ভব ছায়াযুক্ত ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে চলে আসুন।
সংক্রামক ব্যাধি ও মাস্কের সঠিক ব্যবহার
বর্তমানে দেশে হামের প্রকোপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জনাকীর্ণ পশুর হাটে হাজারো মানুষের ভিড়ে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।
মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক: হাটের ধুলাবালি ও বায়ুবাহিত রোগ থেকে বাঁচতে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন।
সঠিক নিয়ম: অনেকেই কথা বলার সময় মাস্ক নাক থেকে নামিয়ে ফেলেন কিংবা থুতনিতে ঝুলিয়ে রাখেন। এই অভ্যাস অত্যন্ত বিপজ্জনক। নাক ও মুখ পুরোপুরি ঢেকে সঠিক নিয়মে মাস্ক না পরলে রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
শিশুদের সুরক্ষায় কঠোরতা
উৎসবে শিশুদের আনন্দ দিতে অনেকেই তাদের সাথে করে পশুর হাটে নিয়ে যান। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের হাটে নেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। অতিরিক্ত গরমে শিশুরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাছাড়া জনাকীর্ণ স্থানে তাদের হাম বা অন্যান্য ছোঁয়াচে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। তাই কেবল শখের বশে শিশুদের কোনো বড় ঝুঁকির মুখে ফেলবেন না।
পায়ের যত্ন ও ডায়াবেটিস রোগীদের সতর্কতা
পশুর হাটে গোবর, পশুর মূত্র ও কাদা মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে। এই নোংরা পরিবেশ জীবাণুর উর্বর ক্ষেত্র।
জুতা পরিধান: হাটে কখনোই খালি পায়ে কিংবা খোলা স্যান্ডেল পরে যাবেন না। পা ভালোভাবে ঢেকে রাখে এমন শক্ত জুতা পরা উচিত।
কাটা-ছেঁড়ার চিকিৎসা: হাটে হাঁটার সময় কোনোভাবে পা কেটে গেলে বা থেঁতলে গেলে ঘরে ফিরে দ্রুত সাবান দিয়ে পা ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর সেখানে অ্যান্টিসেপটিক মলম লাগাতে হবে। ক্ষতের গভীরতা বুঝে চিকিৎসকের পরামর্শে টিটেনাস ভ্যাকসিন বা ধনুষ্টঙ্কারের ইনজেকশন নিতে হবে।
ডায়াবেটিস রোগীদের ঝুঁকি: যাদের পায়ে আগে থেকেই কোনো ক্ষত রয়েছে কিংবা যারা ডায়াবেটিসের রোগী, তাদের পশুর হাটে না যাওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ নোংরা পানি ও গোবর থেকে তাদের পায়ে গুরুতর ইনফেকশন হতে পারে।
ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার
হাটের ধকল ও স্বাস্থ্যঝুঁকি পুরোপুরি এড়াতে বর্তমান সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো দারুণ বিকল্প হতে পারে। এখন ঘরে বসেই বিভিন্ন ডিজিটাল হাটের মাধ্যমে সুস্থ ও নিরাপদ কোরবানির পশু যাচাই-বাছাই করে কেনা সম্ভব। এই সুযোগটি কাজে লাগালে নিজে যেমন সুস্থ থাকা যাবে, তেমনি পরিবারকেও বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে। মনে রাখবেন, উৎসবের আনন্দের চেয়ে আপনার ও আপনার পরিবারের সুস্থতাই সবার আগে।
