রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হুট করেই শুরু হয় বিকট শব্দ। ঘরের একজনের নাক ডাকার কারণে অন্য সদস্যদের ঘুম হারাম হওয়ার চিত্র আমাদের সমাজে খুবই পরিচিত। অনেকের কাছে এটি কেবলই একটি সাধারণ অভ্যাস বা গভীর ঘুমের লক্ষণ মনে হতে পারে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। নিয়মিত ও তীব্র শব্দে নাক ডাকা আসলে এক ধরনের ঘুমজনিত সমস্যা। এটি কেবল অন্যের ঘুমেরই ব্যাঘাত ঘটায় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে ডেকে আনতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। চিকিৎসকদের মতে, তীব্র নাক ডাকা অনেক সময় ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ বা ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর রোগের পূর্বলক্ষণ হতে পারে।
নাক ডাকা আসলে কী এবং কেন হয়?
ঘুমের সময় যখন মানুষের শ্বাসনালী আংশিকভাবে সংকুচিত বা সরু হয়ে যায়, তখন বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। এই বাধার কারণে গলার নরম টিস্যুগুলোতে তীব্র কম্পন তৈরি হয় এবং তা থেকেই নাক ডাকার শব্দের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন কারণে শ্বাসনালীর এই স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হতে পারে:
- নাক বন্ধ থাকা: সর্দি, অ্যালার্জি কিংবা সাইনাসের সংক্রমণের কারণে নাক বন্ধ থাকলে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যাহত হয়। ফলে নাক ডাকার প্রবণতা বাড়ে।
- শারীরিক গঠনগত সমস্যা: জন্মগত বা বংশগত কারণে অনেকের নাক বা মুখের ভেতরের গঠনে ত্রুটি থাকে। যেমন- বাঁকা নাকের হাড় (ডিভিয়াটেড সেপ্টাম), লম্বা নরম তালু কিংবা ছোট চোয়াল বাতাস চলাচলে বাধা দেয়।
- বড় টনসিল: টনসিল স্বাভাবিকের চেয়ে আকারে বড় হলে তা গলার ভেতরের খালি জায়গাটি ছোট করে ফেলে।
- অতিরিক্ত ওজন: শরীরের ওজন অতিরিক্ত বাড়লে ঘাড় ও গলার চারপাশে চর্বি জমা হয়। এই চর্বি ঘুমের সময় শ্বাসনালীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
- অ্যালকোহল ও ঘুমের ওষুধ: ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল পান করলে কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘুমের ওষুধ (সেডেটিভ) খেলে গলার পেশীগুলো অতিরিক্ত শিথিল হয়ে পড়ে। এতে শ্বাসনালী সহজেই সংকুচিত হয়।
- ঘুমানোর ভঙ্গি: যারা চিত হয়ে বা পিঠের ওপর ভর দিয়ে ঘুমান, তাদের জিহ্বা এবং নরম তালু পিছনের দিকে ঝুলে পড়ে শ্বাসনালী আংশিক বন্ধ করে দেয়।
লক্ষণ ও প্রকারভেদ
নাক ডাকা নিজেই একটি বড় লক্ষণ। তবে এর সাথে আরও কিছু শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন—উচ্চ শব্দে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে হঠাৎ হাঁপিয়ে ওঠা বা দম বন্ধ হওয়ার অনুভূতি, ঘুম থেকে ওঠার পর গলা শুকিয়ে যাওয়া বা ব্যথা করা, সারাদিন অতিরিক্ত ক্লান্তি ও তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব, কোনো কাজে মনোযোগ দিতে না পারা এবং খিটখিটে মেজাজ বা মানসিক অস্থিরতা।
চিকিৎসকদের মতে, সব নাক ডাকা এক রকম হয় না। এর মূলত চারটি প্রকারভেদ রয়েছে:
১. অনুনাসিক বা নেজাল: নাকের ভেতরের কোনো বাধার কারণে এই শব্দ হয়।
২. জিহ্বাভিত্তিক: ঘুমের মধ্যে জিহ্বা পেছনের দিকে সরে গিয়ে শ্বাসনালী আটকে দিলে এই সমস্যা হয়।
৩. প্যালাটাল: মুখের ভেতরের নরম তালু এবং ইউভুলার অতিরিক্ত কম্পনের ফলে এই শব্দ তৈরি হয়।
৪. মিশ্র ধরন: যখন একাধিক কারণ একসাথে কাজ করে, তখন একে মিশ্র নাক ডাকা বলা হয়।
ঝুঁকিতে আছেন কারা?
চিকিৎসা সাময়িকী ও গবেষকদের মতে, যেকোনো মানুষেরই এই সমস্যা হতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে নাক ডাকার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এছাড়া বয়স বৃদ্ধি, স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস, বংশগত কারণ এবং নাক-গলার গঠনগত সমস্যা এই ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতি
নাক ডাকা যদি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তবে অবহেলা না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। সাধারণত তিনটি উপায়ে এই রোগ নির্ণয় করা হয়:
- শারীরিক পরীক্ষা: চিকিৎসক রোগীর নাক, মুখ ও গলা পরীক্ষা করে ভেতরের কোনো বাধা বা ত্রুটি চিহ্নিত করেন।
- পলিসমনোগ্রাম বা স্লিপ টেস্ট: রোগীকে একটি বিশেষ ল্যাবে রাতে ঘুমিয়ে রেখে তার শ্বাস-প্রশ্বাস, মস্তিষ্কের তরঙ্গ এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
- ইমেজিং: প্রয়োজনবোধে এক্স-রে বা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে শ্বাসনালীর ভেতরের নিখুঁত ছবি দেখা হয়।
রোগের তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে এর আধুনিক চিকিৎসা করা হয়। জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করে ওজন কমানো ও ধূমপান-মদ্যপান বর্জন করা এর প্রাথমিক চিকিৎসা। এছাড়া শ্বাসনালী খোলা রাখার জন্য ঘুমানোর সময় মুখে ব্যবহারের বিশেষ ‘ম্যান্ডিবুলার ডিভাইস’ বা নাকের স্ট্রিপ ও স্প্রে ব্যবহার করা হয়। পাশ ফিরে ঘুমানোর অভ্যাস করানোর জন্য ‘পজিশনাল থেরাপি’ দেওয়া হয়। আর কোনো পদ্ধতিতে কাজ না হলে, সবশেষে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গলার অতিরিক্ত টিস্যু ফেলে দিয়ে শ্বাসনালী বড় করা হয়।
কখন যাবেন চিকিৎসকের কাছে?
নাক ডাকার সাথে যদি সারাদিন প্রচণ্ড ক্লান্তি থাকে, ঘুমের মধ্যে দম আটকে যায়, রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তীব্র মাথাব্যথা হয় এবং দৈনন্দিন কাজে মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়, তবে কালবিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রতিরোধ ও ঘরোয়া সমাধান
কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললে ঘরোয়াভাবেই এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রতিদিন সুষম খাবার ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ঘুমানোর ঠিক আগে মদ্যপান বা ভারী খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তোলা এবং শোবার ঘরকে আরামদায়ক রাখা প্রয়োজন। সেই সাথে শরীর যেন পানিশূন্য না হয়, সেজন্য সারাদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে হবে।
সহজ কিছু ঘরোয়া কৌশলের মধ্যে রয়েছে—সব সময় চিত হয়ে না শুয়ে পাশ ফিরে ঘুমানো। ঘুমানোর সময় মাথা বিছানা থেকে কিছুটা উঁচুতে (বাড়তি বালিশ ব্যবহার করে) রাখা। ঘরের বাতাস শুষ্ক হলে ‘হিউমিডিফায়ার’ ব্যবহার করা, যাতে নাক ও গলা শুকিয়ে না যায়। এছাড়া ধুলাবালি ও অ্যালার্জির উৎস থেকে দূরে থাকা এবং গলার পেশী শক্ত করার কিছু বিশেষ ব্যায়াম করা যেতে পারে।
নাক ডাকা কোনো হাস্যরসাত্মক বিষয় নয়, এটি একটি নীরব শারীরিক জটিলতা। সঠিক সময়ে সচেতনতা, জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তন এবং প্রয়োজনে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
