টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও বৈরী আবহাওয়া ইঁদুরের বংশ বিস্তারের জন্য অত্যন্ত উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। সম্প্রতি জলবায়ুর এই পরিবর্তনের কারণে ইঁদুরের সংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা পরোক্ষভাবে হান্টাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। তবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জোর দিয়ে আশ্বস্ত করেছেন যে, সাধারণ মানুষের জন্য এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি এখনো অনেক কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ইঁদুরের মূত্র, বিষ্ঠা কিংবা লালার সংস্পর্শে এলে মানুষ এই ভাইরাসে সংক্রমিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানিয়েছে, আক্রান্ত ইঁদুরের বিষ্ঠা থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া দূষিত কণা শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলেও মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। এছাড়া বাসা তৈরির জন্য ব্যবহৃত ইঁদুরের সংস্পর্শে যাওয়া বিভিন্ন উপকরণ থেকেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। তবে ইঁদুরের কামড় বা আঁচড় থেকে সংক্রমণ হওয়ার ঘটনা একেবারেই বিরল।
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত এমন ব্যক্তিদের মধ্যে হান্টাভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা বেশি দেখা যায়, যারা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কেবিন, শেড, গ্যারেজ বা অন্য কোনো ভবন পরিষ্কারের কাজ করেন। কারণ এসব জায়গায় ইঁদুরের উপদ্রব বেশি থাকে। আবহাওয়া মূলত ইঁদুরের আবাসস্থল, খাবার ও চলাচলের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে, যা ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকিও নির্ধারণ করে।
সিডিসির ‘ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজেস’-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯২-৯৩ সালে ‘এল নিনো’র প্রভাবে হওয়া অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল এবং ‘ফোর কর্নার্স’ অঞ্চলে ইঁদুরের সংখ্যা ও আবাসস্থল ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। কলোরাডো, নিউ মেক্সিকো, অ্যারিজোনা ও ইউটা—এই চারটি অঙ্গরাজ্যের মিলনস্থল ফোর কর্নার্স অঞ্চলে ইঁদুরের এই উল্লম্ফন পরোক্ষভাবে ‘সিন নোমব্রে’ নামক হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছিল।
বর্তমানে অ্যাকুওয়েদারের আবহাওয়াবিদরা আশঙ্কা করছেন, আটলান্টিক ঘূর্ণিঝড় মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই একটি শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’ তৈরি হতে পারে। এই জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে বৃষ্টিপাত ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়তে পারে। এর ফলে গ্রীষ্ম ও শরৎকালে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় সমভূমি থেকে শুরু করে পূর্ব উপকূল পর্যন্ত আর্দ্রতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হলে গাছপালা দ্রুত বাড়ে, যা ইঁদুরের খাদ্যের উৎস বাড়িয়ে দেয়। তবে ঘর-বাড়ি সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে এই রোগের সংক্রমণ ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
সম্প্রতি ‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামের একটি ডাচ প্রমোদতরিতে (ক্রুজ শিপ) হান্টাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, গত ৪ মে পর্যন্ত জাহাজটিতে সাতটি হান্টাভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। ল্যাব পরীক্ষায় বিশেষজ্ঞরা দুজনের শরীরে নিশ্চিতভাবে এই সংক্রমণ খুঁজে পেয়েছেন এবং মৃত তিনজনের শরীরেও এই ভাইরাসের উপস্থিতি মিলেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া যাত্রীদের মধ্যে একজন মার্কিন এবং একজন ফরাসি নারীও হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন। প্রমোদতরির এই প্রাদুর্ভাবটি মূলত হান্টাভাইরাসের একটি বিপজ্জনক ধরন, যা ‘অ্যান্ডিস ভাইরাস’ নামে পরিচিত। মানুষের মধ্যে এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার কারণে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো পরিস্থিতি কড়া নজরদারিতে রেখেছে।
এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের সহকারী সচিব ডা. ব্রায়ান ক্রিস্টিন বলেন, “আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, সাধারণ মানুষের জন্য হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি এখনো অত্যন্ত কম।” সিডিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে ল্যাবভিত্তিক নজরদারি শুরুর পর থেকে ২০২৩ সালের শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া মাত্র ৮৯০টি হান্টাভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সিডিসি পরামর্শ দিয়েছে যে, ইঁদুরের বিষ্ঠা ও মূত্র পরিষ্কার করার আগে ব্লিচ মিশ্রণ বা ইপিএ অনুমোদিত জীবাণুনাশক স্প্রে করে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখতে হবে, তারপর তা পরিষ্কার করতে হবে। সরাসরি শুকনা অবস্থায় ঝাড়ু দিলে বাতাসে কণা ছড়িয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
বিশ্বজুড়ে এই ভাইরাস নিয়ে আলোচনা হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি আশঙ্কাজনক নয়। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, বাংলাদেশের মানুষের জন্য এই ভাইরাসের ঝুঁকি একেবারেই কম। তিনি জানান, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আবহাওয়া বা জলবায়ু পরিবর্তনের ধরনের সাথে হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক বা প্রমাণ এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাই দেশীয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাইরাস নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
