দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে দেশের প্রায় ৩৫.৩ শতাংশ মানুষ তামাকজাতীয় পণ্যে অভ্যস্ত। সংখ্যায় যা প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক। শুধু বড়রাই নয়, ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও তামাকের এই ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। টোব্যাকো অ্যাটলাসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর দেশে প্রায় ২ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। এই সংখ্যাটি দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ১৮ শতাংশ।
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেই বুধবার (২০ মে) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত দেশের শীর্ষস্থানীয় ছাত্রসংগঠন ‘সন্ধানী’। সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদের আয়োজনে এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ-এর কারিগরি সহায়তায় ‘তরুণদের তামাক ব্যবহার শুরু নিরুৎসাহিত করতে তামাকপণ্যের কার্যকর দাম বৃদ্ধি: সন্ধানীর বাজেট প্রস্তাবনা ২০২৬-২৭ অর্থবছর’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। অথচ এর বিপরীতে তামাকের উৎপাদন ও ব্যবহারের কারণে দেশের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তামাক থেকে অর্জিত রাজস্বের তুলনায় সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি।
বক্তারা জানান, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে দেশের সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন—আটা, ডিম ও গুঁড়া দুধের দাম ৩০ থেকে প্রায় ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ সেই তুলনায় তামাকপণ্যের দাম প্রায় অপরিবর্তিত বা নামমাত্র বেড়েছে। এই সময়ে বাজারে নিম্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ১৫.৩৮ শতাংশ। পাশাপাশি উচ্চ স্তরের সিগারেটের দাম প্রায় ১১ শতাংশ এবং জর্দার দাম মাত্র ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ খাদ্যপণ্যের চেয়ে তামাকপণ্য আরও সস্তা এবং সহজলভ্য হয়ে উঠেছে, যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভেতরেই রয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তামাকপণ্যের দাম কার্যকরভাবে বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে সন্ধানী। সংগঠনটির পক্ষ থেকে সিগারেটের বিদ্যমান জটিল স্তর কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তারা বর্তমানের নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে একীভূত করে ১০ শলাকার প্রতি প্যাকেট সিগারেটের সর্বনিম্ন মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানায়। একই সাথে প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়। এছাড়া উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের ১০ শলাকার প্যাকেটের মূল্য যথাক্রমে ১৫০ টাকা এবং ২০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, তরুণ প্রজন্মকে ধূমপানে জড়ানো থেকে বিরত রাখতে তামাকের দাম বাড়ানোই সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র। সন্ধানীর এই প্রস্তাবিত কর ও মূল্য কাঠামো বাস্তবায়ন করা গেলে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ধূমপান ছাড়তে উদ্বুদ্ধ হবে। একই সাথে তামাকের দাম বাড়লে ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ নতুন করে ধূমপান শুরু করার সুযোগ পাবে না। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে অন্তত ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হবে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী জানান, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার চারভাগের একভাগই তরুণ। বর্তমানে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ২২.৩ শতাংশ। বাজারে তামাকের কম মূল্য ও সহজলভ্যতাই তরুণদের এই মরণনেশায় আকৃষ্ট করছে। বর্তমানে সিগারেটের চার স্তরবিশিষ্ট যে কর কাঠামো রয়েছে, সেটি অত্যন্ত জটিল ও অকার্যকর। এর ফলে দাম বাড়লেও ব্যবহারকারীরা সহজেই কম দামি ব্র্যান্ডে চলে যাওয়ার সুযোগ পায়। তামাকের প্রাপ্তি কমাতে কর কাঠামো সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও যোগ করেন, এই মূল্য ও কর সংস্কার নীতি গ্রহণ করলে সরকার তামাক খাত থেকে অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে। এই বাড়তি অর্থ দেশের জনস্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. সাদিকুর রহমান ইফাতের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের উপদেষ্টা ডা. হুমাইরা জামিল হিম। মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ডা. মুকাররাবিন-হক নিবিড়। সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে ডা. সাদিকুর রহমান ইফাত বলেন, তামাকের দাম বাড়লে শুধু সরকারের রাজস্বই বাড়বে না, বরং দেশের লাখ লাখ তরুণ অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং ভবিষ্যতে দেশে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি অনেক কমে আসবে।
