নিয়মিত জিমে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরানোর ব্যস্ততা আধুনিক জীবনযাত্রায় অনেকের জন্যই কঠিন। তবে সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন পেতে অলসতা কাটানো এবং শরীরকে সচল রাখাই এখন অন্যতম প্রধান উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারী ওয়ার্কআউটের বদলে সারাদিনে ছোট ছোট টুকরোয় হালকা শরীরচর্চা করা অত্যন্ত কার্যকর। এই পদ্ধতিকে গবেষকরা ‘এক্সারসাইজ স্ন্যাকিং’ বা ‘স্ন্যাকটিভিটি’ (শরীরচর্চার নাশতা) নামে অভিহিত করছেন।
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার প্রায় দেড় লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণার ডেটা বিশ্লেষণ করে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। নরওয়েজিয়ান স্কুল অব স্পোর্টের শারীরিক কার্যকলাপ ও স্বাস্থ্য বিষয়ক অধ্যাপক উলফ ইকেতুন্ড জানান, প্রতিদিন মাত্র ৫ মিনিটের মাঝারি ধরনের শারীরিক সক্রিয়তা, যেমন—দ্রুত হাঁটা (ব্রিস্ক ওয়াকিং), সাইকেল চালানো বা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠা, প্রায় ১০ শতাংশ অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করতে পারে। সমষ্টিগত স্তরে এটি বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের জীবনকাল বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন যে, ৫ মিনিটের শরীরচর্চা হয়তো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সপ্তাহে ১৫০ মিনিটের মাঝারি ব্যায়ামের লক্ষ্যমাত্রাকে পুরোপুরি স্পর্শ করতে পারে না। তবে এটি অলস বসে থাকার চেয়ে শরীরে দারুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যারা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, তাঁদের জন্য এই ৫ মিনিটের প্রভাব কিছুটা কম হতে পারে; কিন্তু যারা একদমই কায়িক শ্রম করেন না, তাঁদের জন্য এটি একটি জীবন রক্ষাকারী পদক্ষেপ।
এর পাশাপাশি, গবেষকরা অলসভাবে বসে থাকার সময়টুকু কমানোর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনিক বসে থাকার সময় থেকে মাত্র ৩০ মিনিট কমিয়ে যদি সাধারণ হাঁটাচলা করা যায়, তবে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাইনসিওলজির সহকারী অধ্যাপক নিকোল লোগান বলেন, শারীরিক কার্যক্ষমতা, পেশির শক্তি ও গুণমান এবং হাড়ের মজবুতি ভবিষ্যতের দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের অন্যতম প্রধান নির্দেশক। তাই নিষ্ক্রিয়তা কাটানোই দীর্ঘায়ু পাওয়ার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি।
‘এক্সারসাইজ স্ন্যাকিং’ আসলে খাবারের মাঝে হালকা নাশতা বা স্ন্যাকস খাওয়ার মতোই একটি প্রক্রিয়া। এর জন্য কোনো বিশেষ পোশাক বা দামি জিম সরঞ্জামের প্রয়োজন পড়ে না। দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে রান্নাঘরে পাস্তা সেদ্ধ হওয়ার অপেক্ষায় থাকার সময় কয়েকটি স্কোয়াট বা লেগ কিক দেওয়া, বসার ঘরে পছন্দের গানের সাথে একটু নাচ করা, ঘরের মেঝে দ্রুততার সাথে ভ্যাকুয়াম বা পরিষ্কার করা, কিংবা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু জোরে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার মাধ্যমেই এই শারীরিক নাশতা নেওয়া সম্ভব। যে কোনো কাজ যা মানুষের হৃদস্পন্দনকে বা হার্ট রেটকে কিছুটা বাড়িয়ে দেয়, তা-ই এর অন্তর্ভুক্ত।
ছোট ছোট টুকরোয় এই ব্যায়ামের বৈজ্ঞানিক উপকারিতা নিয়ে যুক্তরাজ্যের আলস্টার ইউনিভার্সিটির ব্যায়াম ও স্বাস্থ্য বিষয়ক অধ্যাপক মারি মারফি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, এই পদ্ধতিতে ব্যায়াম করলে শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া বা মেটাবলিজম বারবার উদ্দীপিত হয়। মানুষ যখন ব্যায়াম করা বন্ধও করে দেয়, শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সময়টুকুতেও মেটাবলিজম কিছুটা দ্রুত গতিতেই চলতে থাকে। এর ফলে মেটাবলিজমের চাকাটি সবসময় সচল থাকে, যা মানুষের শরীরের অতিরিক্ত ওজন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সরাসরি সাহায্য করে।
অলস জীবনযাপন কাটানোর জন্য যুক্তরাজ্যের লফবরো ইউনিভার্সিটির আচরণগত চিকিৎসা বিষয়ক অধ্যাপক আমান্ডা ডেলি কিছু সহজ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, নিজের গাড়িটি গন্তব্যস্থল থেকে অন্তত ৫ মিনিট হাঁটা দূরত্বে পার্ক করা অথবা লিফট বা এসকেলেটরের বদলে সিঁড়ি ব্যবহারের অভ্যাস করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো অবচেতনভাবেই মানুষের প্রাত্যহিক অভ্যাসে পরিণত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে শরীরে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
এমনকি হাঁটার ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত দৈনিক ১০ হাজার পদক্ষেপের পুরোনো ধারণাও বর্তমান গবেষণায় ভাঙছে। নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দৈনিক মাত্র ২৫১৭ থেকে ২৭৩৫ কদম হাঁটা, দিনে মাত্র ২০০০ কদম হাঁটার চেয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি প্রায় ১১ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। সুতরাং, ভারী ব্যায়ামের অলসতা বা জিমের অভাবকে অজুহাত না বানিয়ে আজই ‘এক্সারসাইজ স্ন্যাকিং’ শুরু করা উচিত। নিজের সুবিধামতো সারাদিনে মাত্র কয়েক মিনিটের এই শরীরচর্চার অভ্যাস একদিকে যেমন মন থেকে অপরাধবোধ দূর করে, অন্যদিকে শরীর ও মন দুই-ই চনমনে রাখে।
