দেশের স্বাস্থ্য খাতের বাজেট শুধু খাতায়-কলমে বাড়ালেই সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী হবে না। এর জন্য প্রয়োজন বরাদ্দ করা অর্থের সঠিক ও কার্যকর ব্যবহার। একই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্য একটি শক্তিশালী আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় স্বাস্থ্য অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণ বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। ‘স্বাস্থ্য বাজেট: অধিক বরাদ্দ ও সঠিক বাস্তবায়নের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আয়োজন করে পাবলিক ইন্টেগ্রিটি নেটওয়ার্ক ফর এভিডেন্স অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি (পাইনেট)। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পাইনেটের কো-অর্ডিনেটর নাজমুল হাসান।
সেমিনারে ‘বিয়ন্ড বাজেট অ্যালোকেশন: এনসিউরিং ইফেকটিভ ইউটিলাইজেশন’ শিরোনামে একটি তথ্যবহুল নীতিগত উপস্থাপনা তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ এমন একটি স্বাস্থ্য বাজেট দেখতে চায়, যা সবার জন্য বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য, মানসম্মত এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করবে। তবে কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধিই শেষ কথা নয়। এর সাথে সরকারি ব্যয় বাড়ানো, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি দেশের স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে এই বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরে ১ শতাংশেরও নিচে রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষকে তাদের পকেটের প্রায় ৭০ থেকে ৭৩ শতাংশ টাকা চিকিৎসার পেছনে নিজেদের খরচ করতে হচ্ছে, যা অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অধ্যাপক হামিদ তাঁর উপস্থাপনায় আরও উল্লেখ করেন, বছরের পর বছর স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়লেও বরাদ্দের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত অব্যবহৃত থেকে যায়। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে তিনি খণ্ডিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, সেবার পুনরাবৃত্তি, কেনাকাটা ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, ব্যাপক দুর্নীতি এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতিকে দায়ী করেন। একই সাথে ওষুধ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ও সমন্বিত স্বাস্থ্য প্রশাসনের অভাবও বড় বাধা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আরও বেশি বাজেট দাবি করার আগে স্বাস্থ্য খাতকে বিদ্যমান সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার দেখাতে হবে। সেই সাথে বরাদ্দকৃত পুরো অর্থের সঠিক ব্যবহার, জবাবদিহিতা ও সেবাদানের সক্ষমতা প্রমাণ করা জরুরি। চিকিৎসাসেবা সাশ্রয়ী করতে তিনি ফ্যামিলি কার্ডের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য সুরক্ষাব্যবস্থা যুক্ত করার প্রস্তাব দেন। এর মাধ্যমে হাসপাতালে ভর্তি, সাধারণ চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, দুর্ঘটনা ও জরুরি চিকিৎসাসহ জটিল রোগের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ বড় আর্থিক সুরক্ষা পাবে।
বৈঠকে অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আবু মুহাম্মদ জাকির হোসাইন বলেন, আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতে যে জায়গায় বেশি খরচ করা দরকার, ঠিক সেখানেই বরাদ্দ সবচেয়ে কম দেওয়া হয়। দেশের সাধারণ মানুষ আর্থিক সংকটের কারণে কম খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিনামূল্যে ওষুধ পেতে চান। কিন্তু এই পরিচালন খাতে বরাদ্দ কম থাকে। আবার উন্নয়ন খাতে যে বড় বরাদ্দ দেওয়া হয়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সেটারও পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় না। অনেক সময় অর্থবছরের শেষ দিকে এসে টাকা ছাড় হওয়ার কারণে কাজ না করেই কোটি কোটি টাকা সরকারের কাছে ফেরত চলে যায়। উন্নয়ন খাতের এই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নেতৃত্বের দায়িত্বে আনার জন্য তিনি সরকারের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর অবস্থা আরও নাজুক। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব জহিরুল ইসলাম শাকিল মন্তব্য করেন যে, বেশিরভাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক এবং নার্সদের থাকার মতো ন্যূনতম উপযুক্ত পরিবেশ বা আবাসন ব্যবস্থা নেই। এই সংকট দূর করে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে তিনি সংসদ সদস্যদের বিশেষ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
গোলটেবিল বৈঠকে প্রান্তিক মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোসলেহউদ্দিন ফরিদ। তিনি বলেন, চিকিৎসকের উচিত একজন রোগীর ঠিক যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়া। বর্তমানে এর চেয়ে বেশি দেওয়া হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা প্রয়োজন। দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, এমন অনেক দরিদ্র মানুষ আছেন, যাদের এক দিনের পুরো আয় যাতায়াত ভাড়াতেই শেষ হয়ে যায়। এই ভয়ের কারণে তারা হাসপাতালে যেতে চান না। এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা না করলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুফল আসবে না। চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নে তিনি যুক্তরাজ্য, তানজানিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলোর উদাহরণ দেন। তিনি আরও বলেন, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসাসামগ্রী ও মূল্যবান যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর নষ্ট বা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এগুলো দ্রুত সচল ও মেরামত করলেই দেশের স্বাস্থ্য খাতের চেহারা অনেকখানি বদলে যাবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোশতাক হোসেন বলেন, বছর বছর টাকার অঙ্কে বাজেট বাড়লেও মোট বাজেটের শতকরা হারে স্বাস্থ্যের অংশ সেভাবে বাড়ে না। আসন্ন বাজেটে শতকরা হারে বরাদ্দ কতটা বাড়ছে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তিনি প্রস্তাব করেন, দেশের সব নাগরিককে প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসাসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া উচিত। সরকার এই সেবার খরচ জনগণের কাছ থেকে করের মাধ্যমে তুলে নেবে। দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে সাধারণ রোগের প্রায় ৯০ ভাগ চিকিৎসাই সেখানে সম্ভব হয়। তাই আগামী বাজেটে বাড়তি অর্থ যেন মূলত প্রাইমারি স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। তিনি অভিযোগ করেন, হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশবাসীকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন। গত এপ্রিল মাসে মন্ত্রী বলেছিলেন দেশে ছয় মাসের টিকার মজুত আছে। অথচ এখন বলা হচ্ছে ২০২০ সালের পর কোনো টিকাই হাত ছিল না। ভবিষ্যতে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করার আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বিগত ছয় মাসের জেলাভিত্তিক টিকার ডোজের সঠিক হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি।
গোলটেবিল বৈঠকের সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন আশার বাণী শোনান। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার টেকসই রূপান্তরের জন্য সরকার ৫ ও ১০ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। দেশের প্রতিটি নাগরিককে ডিজিটাল স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় আনতে প্রতিটি নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সাথে একটি সুনির্দিষ্ট ‘স্বাস্থ্য কার্ড’ বা ‘ই-হেলথ কার্ড’ যুক্ত করার কাজ চলছে। এর মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা আরও সহজ ও স্বচ্ছ হবে।
উন্মুক্ত আলোচনায় আরও অংশ নেন চাইল্ড ইউরোলজিস্ট ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ শাদরুল আলম, টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শিব্বির আহমেদ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ম্যাগনেটিজম (বিআইজিএম)-এর সহযোগী অধ্যাপক জোবায়ের আহমেদ এবং ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের দপ্তর সম্পাদক এ কে এম জিয়াউল হক। বক্তারা প্রত্যেকেই আসন্ন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ কেবল কাগুজে হিসেবে না রেখে তার বাস্তবমুখী প্রয়োগের ওপর জোর দেন।
