প্রতিদিন রাতে ঠিক কতক্ষণ ঘুমানো প্রয়োজন, তা নিয়ে সচেতনতার শেষ নেই। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ঘুমের স্থায়িত্ব বা কতক্ষণ ঘুমানো হলো তা-ই নয়, বরং প্রতিদিন ঠিক কোন সময়ে ঘুমাতে যাওয়া হচ্ছে—তাও হৃদযন্ত্রের সুস্থতার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমানোর সুযোগ পান না, তাদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস আরও বেশি জরুরি। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস বা অনিয়মিত শয়নকাল হৃদরোগের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়।
ফিনল্যান্ডের ওলু বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Oulu) একদল গবেষক সম্প্রতি এই গবেষণাটি চালিয়েছেন। এই গবেষক দলটি এর আগেও মানুষের ঘুমের ওপর কাজ করেছে। তখন তারা আবিষ্কার করেছিলেন যে, ঘুমের সময় মানব মস্তিষ্ক কীভাবে প্রাকৃতিকভাবে নিজের ভেতরের বর্জ্য পরিষ্কার করে। এবার গবেষকরা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ঘুমের সময় এবং তার ধারাবাহিকতার ওপর নজর দেন। ‘বিএমসি কার্ডিওভাসকুলার ডিজঅর্ডার্স’ (BMC Cardiovascular Disorders) জার্নালে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার জন্য মোট ৩,২৩১ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনন্দিন ঘুমের অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের ঘুমের সঠিক ডেটা বা তথ্য সংগ্রহের জন্য বিশেষ ধরনের পরিধানযোগ্য ডিভাইস বা ট্র্যাকার ব্যবহার করা হয়। টানা ১০ বছর ধরে তাদের স্বাস্থ্যগত পরিবর্তন ও হৃদরোগের ইতিহাস ট্র্যাক করা হয়। দীর্ঘ এক দশকের এই পর্যবেক্ষণ শেষে গবেষকরা একটি আশঙ্কাজনক তথ্য পান। তারা দেখেন, যাদের ঘুমাতে যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই বা যারা একেক দিন একেক সময়ে ঘুমান, তাদের হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের মতো মারাত্মক হৃদরোগের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বা দুই গুণ বেশি।
ওলু বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই গবেষণার প্রধান গবেষক লরা নাউহা (Laura Nauha) এই ঝুঁকির মূল কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, এর পেছনে প্রধান খলনায়ক হলো আমাদের শরীরের নিজস্ব ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ (Circadian Rhythm) বা ২৪ ঘণ্টার অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি। মানবদেহ মূলত এই নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ ঘড়ির নিয়ম মেনে পরিচালিত হয়। যখন কোনো মানুষ প্রতিনিয়ত তার ঘুমাতে যাওয়ার সময় পরিবর্তন করতে থাকেন, তখন প্রতি রাতে শরীরের এই স্বাভাবিক ঘড়িটি ওলোটপালোট হয়ে যায় এবং নতুন করে রিসেট হতে বাধ্য হয়।
লরা নাউহা আরও জানান, মানুষের হৃদযন্ত্র বা হার্ট সারা দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে শরীরকে সচল ও জীবিত রাখে। এই দীর্ঘ খাটুনির পর নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করতে হার্টের একটি নির্দিষ্ট এবং পূর্বনির্ধারিত বিশ্রামের সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ঘুমের সময়ের এই অনিয়মিত পরিবর্তনের কারণে হার্ট তার প্রয়োজনীয় ও প্রত্যাশিত বিশ্রামটুকু পায় না। ফলে শরীরের পুরো রক্তসঞ্চালন ও কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে হৃদযন্ত্রকে দুর্বল করে ফেলে।
মজার বিষয় হলো, গবেষণায় দেখা গেছে যে সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় পরিবর্তনের সাথে হৃদরোগের ঝুঁকির তেমন কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ, হৃদস্বাস্থ্যের জন্য সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময়ের চেয়ে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় অংশ নেওয়া অনিয়মিত ঘুমানো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে তাদের ঘুমাতে যাওয়ার সময়ে প্রায় ২ ঘণ্টার তারতম্য বা হেরফের ঘটেছিল। অন্যদিকে, যারা নিয়মিত একই সময়ে ঘুমান, তাদের ক্ষেত্রে এই সময়ের পার্থক্য ছিল মাত্র আধ ঘণ্টার মতো।
গবেষকরা আরও জানান, এই বাড়তি ঝুঁকির বিষয়টি মূলত তাদের ক্ষেত্রেই বেশি দেখা গেছে, যারা রাতে আট ঘণ্টার কম ঘুমান। তবে যারা অনিয়মিত শিডিউল থাকা সত্ত্বেও কোনোভাবে রাতে পুরো আট ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিতে পারেন, তারা কিছুটা সুরক্ষায় থাকেন। সহজ কথায়, পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম অনিয়মিত শিডিউলের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দিতে পারে এবং ভবিষ্যৎ হৃদরোগের হাত থেকে সাময়িক সুরক্ষা দেয়। তবে এই ক্ষতিপূরণ চিরকাল স্থায়ী হয় না।
তবে গবেষকরা এটা দাবি করেননি যে, অনিয়মিত সময়ে ঘুমানো সরাসরি হৃদরোগের কারণ। তারা স্বীকার করেছেন যে, নিয়মিত ঘুমানোর অভ্যাসের পাশাপাশি স্ট্রেস বা মানসিক চাপ, কাজের ব্যস্ত শিডিউল এবং শরীরের অন্যান্য অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্যগত সমস্যাও হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের জন্য দায়ী হতে পারে। তবে বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর প্রধান কারণ যেহেতু হৃদরোগ, তাই এই গবেষণার ফলাফলকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
দীর্ঘ ১০ বছরের এই গবেষণায় ৩,০০০ এরও বেশি অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ১২৮ জন মারাত্মক হৃদরোগের শিকার হয়েছেন। সংখ্যাটি তুলনামূলকভাবে ছোট মনে হলেও, গবেষকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা ধারা খুঁজে বের করার জন্য এটি যথেষ্ট ছিল। আমরা সবাই রাতে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর পেছনে যতটা ছুটছি, ঘুমাতে যাওয়ার সময়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কথা ততটাই ভুলে যাচ্ছি। অথচ এই ছোট একটি অসচেতনতা ও অনিয়ম দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের অজান্তেই হৃদযন্ত্রের বড় ধরনের ক্ষতি করে চলেছে। তাই হার্ট ভালো রাখতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস গড়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
