করোনা মহামারির রেশ কাটতে না কাটতেই বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ‘হান্টাভাইরাস’ নিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ানো এই ভাইরাসটি এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় প্রাকৃতিকভাবেই বিদ্যমান। যদিও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা খুব বেশি নয়, তবে এটি মাঝেমধ্যে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়ে প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে।
প্রাথমিক লক্ষণ ও শারীরিক জটিলতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হান্টাভাইরাস শনাক্ত করা বেশ কঠিন কারণ এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেকটা সাধারণ জ্বরের মতো। সংক্রমণের শিকার হওয়ার পর অসুস্থতা প্রকাশ পেতে এক থেকে আট সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। শুরুতে আক্রান্ত ব্যক্তির তীব্র জ্বর, পেশিব্যথা ও প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভব হয়। এর পাশাপাশি মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, পেটব্যথা এবং বমি বমি ভাব দেখা দিতে পারে।
রোগটি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছালে ফুসফুসে পানি জমে তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এইচপিএস (HPS) বলা হয়। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির কিডনির কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে (HFRS)।
যেভাবে ছড়ায় এই ভাইরাস
হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরের লালা, বিষ্ঠা কিংবা প্রস্রাবের মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। ইঁদুরের এসব বর্জ্য যখন শুকিয়ে ধূলিকণার সঙ্গে বাতাসে মিশে যায়, তখন নিশ্বাসের মাধ্যমে তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। বিশেষ করে যেসব বদ্ধ স্থানে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা কম এবং ইঁদুরের উপদ্রব বেশি, সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান ঝুঁকি
সম্প্রতি চীন ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশে বিচ্ছিন্নভাবে এই ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়ায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়াও রাশিয়া এবং উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সিডিসি (CDC) আশ্বস্ত করেছে যে, হান্টাভাইরাস বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মহামারি বা ‘প্যানডেমিক’ হওয়ার ঝুঁকিতে নেই। এর প্রধান কারণ হলো, এই ভাইরাসটি একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে সহজে ছড়ায় না। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ঘটনা চিকিৎসা বিজ্ঞানে অত্যন্ত বিরল।
কোন কোন দেশে সংক্রমণ রয়েছে?
১. চীন: উত্তর ও দক্ষিণ চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়ই এই ভাইরাসের বিচ্ছিন্ন সংক্রমণ ঘটে। সম্প্রতি বাসে ভ্রমণকালে এক ব্যক্তির মৃত্যুতে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
২. উত্তর আমেরিকা: যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ‘সিন নোমব্রে’ নামক হান্টাভাইরাসের প্রকোপ লক্ষ্য করা যায়।
৩. দক্ষিণ আমেরিকা: আর্জেন্টিনা ও চিলিতে ‘আন্দিজ’ ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি রয়েছে। এখানে সীমিত আকারে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের কিছু প্রমাণ মিলেছে।
৪. এশিয়া: চীন বাদেও রাশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় এই ভাইরাসের অস্তিত্ব রয়েছে।
৫. ইউরোপ: জার্মানি ও উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে ‘ব্যাংক ভোল’ নামক বিশেষ প্রজাতির ইঁদুরের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়।
প্রতিরোধের কৌশল
এখন পর্যন্ত হান্টাভাইরাস দমনে কোনো সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা কার্যকর টিকা আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে ব্যক্তিগত সচেতনতাই এই রোগ থেকে বাঁচার প্রধান উপায়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ঘরবাড়ি ও চারপাশ সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে যাতে ইঁদুর বাসা বাঁধতে না পারে। ইঁদুরের বর্জ্য পরিষ্কার করার সময় অবশ্যই মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করা জরুরি। এছাড়া সব ধরনের খাবার ও পানীয় ইঁদুরের নাগালের বাইরে ঢেকে রাখতে হবে। মূলত আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এই ভাইরাস মোকাবিলার সেরা পথ।
