বার্ধক্যে শরীরকে সচল ও সুস্থ রাখা কোনো আকস্মিক বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন আগে থেকেই সঠিক প্রস্তুতি। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের শক্তি, ভারসাম্য ও চটপটে ভাব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। আর এই লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করতে পারে মাত্র ১০ মিনিটের একটি বিশেষ ব্যায়াম। ‘পিএলওএস ওয়ান’ (PLOS One) সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। মেঝেতে শুয়ে করার মতো এই সহজ ও কম পরিশ্রমের ব্যায়ামটি শরীরের ভারসাম্য, নমনীয়তা এবং চটপটে ভাব বাড়াতে দারুণ কার্যকর।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমেরিটাস এবং এই গবেষণার সহ-লেখক ৮১ বছর বয়সী ড. ইয়োরিকো এতোমি জানান, তিনি প্রতিদিন সকালে এই ব্যায়ামটি করেন। তার মতে, বয়সকালে পড়ে যাওয়া এড়ানো এবং হাঁটু ও কোমর ব্যথার মতো জয়েন্টের সমস্যা দূর করতে আগাম সতর্কতা অবলম্বন করাই আসল উপায়।
গবেষণায় যা দেখা গেছে
এই গবেষণাটি মূলত দুটি অংশে পরিচালনা করা হয়। প্রথম অংশে ১৭ জন সুস্থ তরুণকে দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ১০ মিনিট করে এই ব্যায়ামটি করানো হয়। এই সময়ে গবেষকরা তাদের নমনীয়তা, শক্তি ও ভারসাম্য পরীক্ষা করেন। গবেষণার দ্বিতীয় অংশে অংশ নেন ২২ জন পুরুষ ও নারী। একটি বিশেষ ‘সাইড-স্টেপ’ পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে মোশন সেন্সর লাগিয়ে তাদের ভারসাম্য মেপে দেখা হয়।
গবেষকরা ফলাফল বিশ্লেষণ করে জানান, মাত্র ১০ মিনিটের এই ব্যায়ামটি করার পর অংশগ্রহণকারীদের শরীরের ভারসাম্য, নমনীয়তা এবং গতিশীলতায় দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। দাঁড়িয়ে থাকার পরীক্ষায় তাদের শরীর আগের চেয়ে কম দুলেছে এবং পাশপাশি নড়াচড়া করার গতি বেড়েছে। সেই সঙ্গে বসে সামনের দিকে ঝুঁকে পায়ের আঙুল ছোঁয়ার পরীক্ষায় তাদের শরীরের নমনীয়তা বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এই ব্যায়ামের ফলে শরীরের সামগ্রিক শক্তি, হাতের মুঠোর জোর, লাফানোর দূরত্ব বা দৌড়ানোর গতিতে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি।
ব্যায়ামটি করার নিয়ম
পুরো ব্যায়ামটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করতে হয়:
প্রথম ধাপ (পেটের পেশির ব্যায়াম): চিত হয়ে শুয়ে প্রথমে দুই হাঁটু ভাঁজ করতে হবে। এরপর দুই হাত পেটের ওপর রেখে আঙুলের ডগা দিয়ে পেটে হালকা চাপ দিতে হবে। এবার পেটের পেশি সংকুচিত করে আঙুলের চাপটিকে উল্টো দিকে ঠেলে দিতে হবে এবং তারপর শিথিল করতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি মোট ৩ বার করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ (পেলভিস বা নিতম্বের ব্যায়াম): একইভাবে হাঁটু ভাঁজ করে চিত হয়ে শুয়ে পেটের হাত রাখতে হবে। পেট সংকুচিত করে নিতম্বের অংশটি মেঝে থেকে সামান্য ওপরে তুলতে হবে এবং পেলভিস বা শ্রোণীচক্রটি পেছনের দিকে হেলাতে হবে। এই অবস্থায় ৫ সেকেন্ড ধরে রেখে শরীর শিথিল করতে হবে। এভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি ১০ বার পুনরাবৃত্তি করতে হবে।
তৃতীয় ধাপ (পায়ের পাতা ও আঙুলের ব্যায়াম): এবার দুই পা সোজা করে চিত হয়ে শুতে হবে। পায়ের তলদেশ মেঝের সংস্পর্শে রেখে একটি হাঁটু ভাঁজ করে শরীরের যতখানি সম্ভব কাছে আনতে হবে। এই অবস্থায় ভাঁজ করা পায়ের আঙুলগুলো ভেতরের দিকে কোঁকড়ানো বা গুটিয়ে নিতে হবে। এরপর গোড়ালি মেঝেতে ঘষে পা সোজা করার সময় পায়ের পাতাটি ওপরের দিকে (শরীরের অভিমুখে) কোণাকুণি করে রাখতে হবে। পা সোজা হলে পায়ের আঙুল দিয়ে ‘রক, পেপার, সিজার্স’ খেলার মতো একটি অনুশীলন করতে হবে। এখানে ‘রক’ মানে আঙুলগুলো শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করা, ‘সিজার্স’ মানে বুড়ো আঙুলটি ওপরের দিকে তোলা এবং ‘পেপার’ মানে সব আঙুল ছড়িয়ে দেওয়া। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ৫ বার করতে হবে।
কিয়োরিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও ফিজিওথেরাপিস্ট ড. টোমোয়াকি এতোমি বলেন, এই ব্যায়ামগুলো সহজ এবং এতে শরীরের ওপর চাপ কম পড়ে। ফলে যে কেউ ঘরে বসেই এটি করতে পারেন। তবে ব্যায়ামের সঠিক কৌশলের ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, বিশেষ করে পেটের মূল পেশির সক্রিয়তা, পায়ের নিচের অংশের সমন্বয় এবং গোড়ালি ও আঙুলের সঠিক নড়াচড়া নিশ্চিত করা জরুরি।
সুস্থ বার্ধক্যে এর প্রয়োজনীয়তা
ওয়েভ ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যান্ড পাইলেটস-এর ফিজিওথেরাপিস্ট ড. মলি গিয়ারিন জানান, যেকোনো বয়সেই শরীরের ভারসাম্য ও চটপটে ভাব থাকা জরুরি, তবে বয়সের সাথে সাথে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। তিনি উল্লেখ করেন, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে যেকোনো আঘাতের অন্যতম প্রধান কারণ হলো আচমকা পড়ে যাওয়া। শরীরের ভারসাম্য, নমনীয়তা ও নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে মানুষ নিজেকে বাইরের কোনো ধাক্কা (যেমন কুকুরের ধাক্কা বা ফুটপাতে হোঁচট খাওয়া) থেকে রক্ষা করতে পারে না। তাই এই ধরনের ব্যায়াম পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি এবং সামগ্রিক আঘাতের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। এছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের ভালো ভারসাম্য ও চটপটে ভাব দীর্ঘায়ু লাভের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন?
গবেষণাটি মূলত তরুণদের ওপর করা হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এর উপযোগিতা সবার জন্যই রয়েছে। ড. টোমোয়াকি এতোমি বলেন, এটি যেহেতু অত্যন্ত নিরাপদ ও কম পরিশ্রমের ব্যায়াম, তাই যারা নতুন ব্যায়াম শুরু করছেন, বয়োবৃদ্ধ, কায়িক শ্রমহীন জীবনযাপন করেন কিংবা কোনো রোগ থেকে সেরে উঠছেন—তাদের জন্য এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।
ড. মলি গিয়ারিন যোগ করেন, এই ব্যায়ামটি শরীরের মূল অংশের স্থায়িত্বের সাথে নিচের অংশের সমন্বয় সাধন করে, যা আমাদের দৈনন্দিন চলাফেরার জন্য অপরিহার্য। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বা অলস জীবনযাপনের কারণে মানুষের পেশির ভর ও স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিকভাবেই কমতে থাকে। তাই প্রবীণ ও নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদের জন্য এটি বেশি উপকারী। সুস্থ থাকার এই প্রক্রিয়াটিকে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করার পরামর্শ দিয়ে ড. ইয়োরিকো এতোমি বলেন, “প্রতিদিন সকালে দাঁত মাজার মতোই এই ব্যায়ামটিকেও আপনার রোজকার রুটিন বানিয়ে নিন।”
